হযরত উমর (রাঃ) : সশ্রদ্ধে স্মরণ

83
18

দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ):
সশ্রদ্ধায় স্মরণ

রাসূল (সঃ) এর বিশিষ্ট সাহাবী, খোলাফায়ে রাশিদুন এর অন্যতম, ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রূপকার হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্মগ্রহণ করেন ৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। প্রধান সাহাবীদের অন্যতম আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর ওফাতের পর তিনি দ্বিতীয় খলীফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। উমর (রাঃ) ইসলামী আইনের একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ ছিলেন। ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে “আল-ফারুক” (সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। আমীরুল মু’মিনীন উপাধিটি সর্বপ্রথম তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রিয় নবীজীর বিবি হযরত হাফসা (রাঃ) এর পিতা হওয়ায় তিনি ছিলেন নবীজীর শ্বশুরও

ইসলাম গ্রহণঃ
নবুওয়াতের প্রথম পর্যায়ে উমর (রাঃ) ছিলেন ঘোর ইসলাম বিরোধী । মক্কার নবদীক্ষিত মুসলিমদের উপর তিনি নির্যাতন চালাতেন । তিনি ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করছিলেন বটে, কিন্তু পরোক্ষে ইসলামের প্রভাবে তাঁর শুভবুদ্ধি ক্রমশ জাগরিত হচ্ছিল । রাসূল (সঃ) এর অজ্ঞাতসারে একদা তার মুখে কুরানের আবৃত্তি শুনিয়া তাহার মনে ভাবান্তর ঘটার বর্ননা পাওয়া যায় । একদিন ভগিনী ও ভগ্নীপতিকে ইসলামে গ্রহণের জন্য নির্দয়ভাবে শাসন করিতে গিয়ে নিজেই তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং রাসূল (সঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন ।
হযরত উমর ৬১৬ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের ফলে তাঁর জীবনের আমূল পরিবর্তন হয় । পরবর্তীকালে তিনি ইসলামের সেবার অক্ষয় কীর্তি রেখে যান ।
ইসলাম গ্রহণের প্রভাবঃ
ইসলাম গ্রহণের পর উমর এসময় মুসলিমদের সবচেয়ে কঠোর প্রতিপক্ষ আবু জাহলকে তা জানান। উমরের ইসলাম গ্রহণের পর প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ আদায় করাতে মুসলিমরা বাধার সম্মুখীন হয় নি। ইসলাম গ্রহণের পর গোপনীয়তা পরিহার করে প্রকাশ্যে তিনি মুসলিমদের নিয়ে বাইরে আসেন এবং কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি ছাড়াও হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন। সেদিন নবীজী তাকে “ফারুক” উপাধি দেন।

তবে আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইবনে হিশামের বর্ননায় ওমরের ইসলাম গ্রহণের আরেকটি ঘটনা এসেছে যে[২১], এক রাতে ওমর ইসলামী নবী মুহাম্মদ কে কাবার প্রাঙ্গণে নামাজরত অবস্থায় অনুসরণ করছিলেন, তখন তার মুখে কুরআনের বাণী শুনে তার মনে হলো, এটি মানব রচিত নয়, ঈশ্বর রচিত বাণী। তখন তিনি মুহাম্মাদ কে জানালেন যে ইসলাম তার অন্তরে প্রবেশ করেছে।

তবে সকল বর্ননাকারী এ ব্যাপারে একমত, ওমরের ইসলাম গ্রহণে মুসলমানদের মনোবল যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। সহীহ বুখারীর বর্ননামতে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এ প্রসঙ্গে বলেন, যখন উমর মুসলিম হন তখন থেকে আমরা সমানভাবে শক্তিশালী হয়েছিলাম এবং মান সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পেরেছিলাম।

মদিনায় হিজরত সম্পাদনা
মক্কায় নির্যাতনের কারণে এবং মদিনা (তৎকালীন ইয়াসরিব) থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আসায় মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করতে থাকে। অধিকাংশ ব্যক্তিই ধরা পড়ার ভয়ে রাতে হিজরত করতেন। কিন্তু উমর দিনের বেলায় (বিশজন সাহাবীসহ) প্রকাশ্যে হিজরত করেন। তখন তিনি কাফেরদের লক্ষ্য করে বলেন,‘কে আছো নিজ স্ত্রীকে বিধবা করবে? কে আছো নিজ সন্তানকে এতীম করবে? আসো আমার সঙ্গে মোকাবেলা করো!’ এসময় তার সাথে সাঈদ ইবনে যায়িদ ছিলেন।

মদিনার জীবন
নবীজী মদিনায় হিজরত করার পর হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন করে দেন। উমরের সাথে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৬২৪ সালে উমর বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৬২৫ সালে তিনি উহুদের যুদ্ধেও অংশ নেন। পরবর্তীতে তিনি বনু নাদির গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানেও অংশ নিয়েছেন।
৬২৫ সালে মুহাম্মদ এর সাথে উমরের মেয়ে হাফসা বিনতে উমরের বিয়ে হয়।
৬২৭ সালে তিনি খন্দকের যুদ্ধ,৬২৮ সালে তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশ নেয়া এবং সাক্ষ্য হিসেবে এতে স্বাক্ষর করা, ৬২৮ সালে উমর খায়বারের যুদ্ধে অংশ নেয়া, ৬৩০ সালে মক্কা বিজয়ের সময় উমর এতে অংশ নেয়া এবং পরে হুনায়নের যুদ্ধ এবং তাইফ অবরোধে তিনি অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

তাবুকের যুদ্ধে সাহায্য হিসেবে তিনি তার সম্পদের অর্ধেক দান করে দিয়েছিলেন। বিদায় হজ্জেও তিনি অংশ নিয়েছেন।

খেলাফতঃ
হযরত আবু বকর (রা.) এর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। উমরের শাসনামলে খিলাফতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এসময় সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। তাঁর শাসনামলে জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হয়। তিনি পূর্বের খ্রিষ্টান রীতি বদলে ইহুদিদেরকে জেরুজালেম এ বসবাস ও উপাসনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি ইসলামী সাম্রাজ্যকে পূর্বে পারস্য থেকে পশ্চিমে বর্তমান তিউনিসিয়া, দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে উত্তরে ককেশাস পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ঈসায়ী ৬৪৪ সালের ৩রা নভেম্বর, ২৩ হিজরীর ২৬শে জিলহজ্জ্ব জনৈক পারসিক কৃতদাসের হাতে শহীদ হন।

হযরত উমর (রা.) এর জীবনের অসংখ্য অবদানের কিছু অবদান সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

১. হযরত ওমর (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের গুটিকয়েক শিক্ষিত লোকদের মধ্যে অন্যতম। সমগ্র আরবে স্বল্প যে কয়জন লোক অক্ষরজ্ঞানের অধিকারী ছিল, হযরত উমর (রা.) ছিলেন তাদের মধ্যে একজন।

২. যৌবনে হযরত ওমর (রা.) কুস্তিগীর, মল্লযোদ্ধা এবং বক্তা হিসেবে খ্যাত ছিলেন।

৩. হযরত উমর (রা.) এর উৎসাহেই রাসূল (সা.) কাবার চত্ত্বরে মুসলমানদের নিয়ে জাময়াতে নামায আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমে মুসলমানরা প্রথমবারের মত মক্কায় প্রকাশ্যে নামায আদায় করে।

৩. রাসূল (সা.) প্রথম তাকে আল-ফারুক (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নামে ভূষিত করেন।

৪. নামাযের জন্য আযান দেওয়ার ব্যবস্থা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) এবং হযরত উমর (রা.) এর স্বপ্নের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়।

৫. রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের পর খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকর (রা.) এর নাম প্রথম হযরত ওমর (রা.) উত্থাপন করেন এবং তিনিই প্রথম আবু বকর (রা.) এর কাছে বাইয়াত করেন।

৬. হযরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.) এর পরামর্শেই প্রথম কুরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং এই লক্ষ্যে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন।

৭. হযরত আবু বকর (রা.) তার ইন্তেকালের সময় হযরত ওমর (রা.) কে খলীফা হিসেবে নিযুক্তির জন্য মুসলিম জনসাধারণের কাছে সুপারিশ করে যান এবং এই সুপারিশের ভিত্তিতেই হযরত ওমর (রা.) খলীফা হিসেবে নির্বাচিত হন।

৮. হযরত উমর (রা.) প্রথম খলীফা যিনি আমীরুল মুমিনিন (বিশ্বাসীদের নেতা) উপাধিতে ভূষিত হন।

৯. হযরত উমর (রা.) এর শাসনকালেই তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি; পারসিক সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং রোমান বাইজান্টানীয় সাম্রাজ্যকে মুসলমানরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যে এবং বাইজান্টানিয় শাসনাধীন এশীয় ও আফ্রিকান অঞ্চলসমূহে মুসলিম শাসনের বিস্তার করে।

১০. ৬৩৭ ঈসায়ীতে হযরত ওমর (রা.) জেরুসালেম সফর করেন এবং রোমানদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অসংখ্য নবীর স্মৃতিধন্য বাইতুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদুল আকসাকে পুননির্মাণ করেন।

১১. মুসলিম খিলাফতের সচিবালয়, বাইতুল মাল (কোষাগার), সেনানিবাস, প্রাদেশিক শাসন ও বিচারব্যবস্থা ওমর (রা.) প্রথম প্রবর্তন করেন। এছাড়া মুসলিম মুদ্রা ব্যবস্থা এবং হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন তার হাত ধরেই সম্পন্ন হয়।

১২. হযরত ওমর (রা.) প্রথম মুসলিম শাসক যিনি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।

ইসলাম আকাশের দ্বিতীয় সূর্য হযরত উমরের ন্যায়পরায়ণতা, জবাবদিহিতা, সততা, খোদাভীরুতা ইত্যাদি সকলের অনুপম আদর্শ হয়ে থাকবে যুগে যুগে। পবিত্র জ্বিলহজ্জ্ব মাসে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ) আততায়ীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন।

——
সংকলনে
মোঃ নাজিম উদ্দিন
১৪ আগষ্ট ২০২১

(সংগৃহীত।
অন্যতম সূত্রাবলীঃ
উইকিপিডিয়া, বিডি২৪লাইভ)

83 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here