সেকালের আষাঢ়ঃ মাছ ধরার বাজার

0
38

সেকালের আষাঢ়ঃ মাছ ধরার বাজার
——-

সময়টা আজ থেকে ২৫ বা ৩০ বছর আগের। ঝুম বৃষ্টি। ইংরেজিতে বলা হয় cats and dogs. এ বৃষ্টিতে গ্রামের শৈশব ছিলো মধুর, হৈ হুল্লোড়, আনন্দে ভরপুর। টইটুম্বুর বিল ঘাট। রাস্তায়ও পানি। পুকুর ডুবে বিল-পুকুর সয়লাভ। অনেকসময় কত তম বান (বন্যা) সেটাও হিসাব করতাম। কি করতেন গ্রামের মানুষজন?

একদল লোক হাত জাল নিয়ে ছুটে চলে রাস্তার ধারে এমনকি বন্যা প্লাবিত রাস্তায়ও জাল ফেলতেন। যেহেতু পুকুর ডুবে সয়লাভ, সেহেতু পুকুর থেকে রুই কাতাল বের হয়ে বন্যার পানিতে চলে যেতো। বড় জাল (কিছুটা বেশি ওজনের, কিছুটা বড় নেটের, যা সংক্ষেপে “বজ্জাল” খ্যাত ছিলো) দিয়ে এসব রুই কাতাল বা বিলের বোয়াল মাছ ধরতে পেতেন মৌসুমী জেলেরা।  আজকের দিনে হলে সে সব মাছের সাথে সেলফি তুলতো তরুণ, কিশোরেরা। তখনকার দিনে একদল জাল দিয়ে মাছ ধরতে এলে আরেক দল শুধু দেখে আনন্দ পেতো। বাড়িতে এসে বলতো, আজ অমুক বাড়ির অমুক জাল দিয়ে বিরাট বোয়াল মাছ পেয়েছে।
ছোট জাল, ঝাঁকি জাল বা গ্রামের ভাষায় “জাঁআই জাল” নিয়ে যারা নামতেন, তাদের দৃশ্য আরো চমৎকার। জাল ফেলতে ফেলতে একসময় মলা মাছের ঝাঁকের উপর পড়তো জাল। সে কী দারুন দৃশ্য। জালের উপর থেকে নীচ- সব সাদা শুভ্র মলা মাছে ভরপুর। রাস্তার মাঝে বা কুলে এনে জাল বিলিয়ে দিতেন আর অমনি ঝাঁকি দেয়ার সাথে সাথে মলা মাছ পড়তো নীচে। বানের বা বন্যার পানির মলা মাছ কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না করা হতো। সে কী অমৃত!

অপেক্ষাকৃত কম পানি থাকলে নালা বা কালভার্টের মুখে পানি চলাচলের স্থানে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বসানো হতো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি “চাআই”, যাতে মলা, পুটি মাছ আটকে থাকতো।

আমাদের সময়ে যারা জাল ফেলতো না, তাদের মাছ ধরার আরেকটি পন্থা ছিল, তা হলো, বরশি। শুধু একটি বাঁশের কঞ্চি, ২/৩ ফুট নাইলন সুতা আর কম দামি (এক টাকায় ১/২ টাও পাওয়া যেত) বরশি নিয়ে ছুটে চলতো রাস্তার ধারে। কয়েক হাত দুরে করে সারি সারি বরশি রাস্তার ধারে নরম মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। খাবার ছিলো সে কেঁচো। একেকজন ক্ষেত্র বিশেষে ১০/২০/৩০ টা বা অধিক বরশি বসাতো, বিশেষ করে তরুণ ববা কিশোরেরা। কতক্ষণ পর শুধু বরশির সুতো টেনে দেখা হতো। টাকি, কই, মাগুর ইত্যাদি মাছ আটকে থাকতো বরশীতে। সে কী আনন্দ!

আরেক শ্রেণীর সাহসি মানুষ অথৈ পানিতে ফেলতেন নেট বা ইলেকট্রিক জাল, যাকে গ্রামে “ভাসা জাল” বলা হতো। গলা পানি পার হয়ে বন্যার পানির মাঝে কয়েক শত গজ লম্বা জাল বসানো হতো। কয়েক ঘন্টা পর পর কোমরে ‘ডেকসি’ বা ‘ডুলা’ বেঁধে নেমে পড়তেন মাছ তোলার উদ্দেশ্য। বড় বড় মাছ আটকাতো সে ভাসা জালে। এ অনেক সময় গলা পরিমাণ পানিতে সয়লাভ হতো বিল ঘাট। তখন শুধু মাথাটা উঁচু করে মাছ তুলতো মৌসুমী সে জেলে! বিব্রতকর বা ঝুঁকির বিষয় ছিলো, কিছু সাপও আটকাতো এ জালে। তখন তারা সে জালের একাংশ কেটে ফেলতো। এদিকে দুষ্টু, দুরন্ত কিশোরের দল আবার সে টুকরো ভাসা জাল থেকে সাপ ফেলে দিয়ে নিজেরা ব্যবহার করতো মাছ ধরার কাজে।

যাদের হাতে জাল থাকতো, তাদের কেউ কেউ বিল ঘাট থেকে এসে জাল ফেলতো বাড়ির পুকুরে। এ নিয়ে চলতো লুকোচুরি ও। যারা বেশি মাছ ধরতে পারতেন, তারা বাজারে সেসব মাছের একাংশ বিক্রি করতেন। কারণ দুটোঃ অভাব কিংবা রেফ্রিজারেটরের অভাব।

রাউজান ইউনিয়নে আমাদের সময়ে আমাদের কাছে মাছ ধরার সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্থান ছিলো রমজান আলী হাটের ঠিক পশ্চিমে (বর্তমান এনআরবিসি ব্যাংক সংলগ্ন) কালভার্টের দুপাশ। (তখন জায়গাটাকে “অঁঅতালা বলা হতো).. হাত জালে যখন মাছ আসতো, কিশোর তরুণদের সে কী চিৎকার! যেন সে নিজে মাছ ধরেছে। এ ছিলো এক অকৃত্রিম আনন্দ, এলাকার বড়জন বা মৌসুমি জেলেদের আনন্দ নিজের করে নেয়া। এ ছিলো পরের সুখে হাসার বিরল সুখ, যা মোবাইল প্রযুক্তি বা গেইমস কেড়ে নিয়েছে বলা যায়।
রাতের বেলা মাছ ধরার দৃশ্যও ব্যতিক্রমি ছিলো। কেউনজাল দিয়ে, কেউ বড় ছুরি/ তলোয়ার দিয়ে মাছ ধরতে যেতেন। সাথে তখনকার প্রচলিত লম্বা টর্চ লাইট (যা বিদেশ প্রবাসিগণের দ্বারা পাঠানো হতো)। নিস্তব্ধ বিলে বা রাস্তার ধারে জাল ফেলে বা তলোয়ার দিয়ে মাছ কাটার এ দৃশ্য গ্রামের বন্যায় এখন আছে কি না জানা নেই, তবে আমাদের শৈশবে তা ছিল টইটুম্বুর।

বর্ষার সময়ে অন্য কাজ বন্ধ থাকলেও আবালবৃদ্ধবণিতা বিভিন্নভাবে লেগে থাকতো মাছ ধরার প্রতিযোগিতায়। আনন্দে মৃখর ছিল আমাদের শৈশব, কৈশোর।

——

১৯ জুন ২০২১