সর্বশ্রেষ্ঠের জীবন কথাঃ নবী জীবনী

130
34

সে সময় ছিল আরব জাহানের ঘোর দুর্দিন। চারিদিকে অন্ধকার, অজ্ঞতা অন্ধকার, মূল্যবোধহীনতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার। চারদিকে একমাত্র অন্যায়-অসত্যের দাপট; যার প্রভাবে একই রক্ত-মাংসের  হয়েও কন্যা হওয়ার দায়ে মেনে নিতে হত বর্বরতম নিপীড়ন,  জীবন্ত পুঁতে ফেলা হত কন্যা সন্তানদের, একমাত্র সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট হয়েও যেখানে স্বীকার কা হত একাধিক সৃষ্টিকর্তার অবিশ্বাস্য অস্তিত্ব (নাউজুবিল্লাহ)। সেটা এমন সমাজ ছিল যে সমাজে পবিত্র পানীয় দুধের স্থান দখল করে নিত মদ,  সাম্য ও ন্যায়বিচারেরর স্থান দখল করে নিত পেশীবল ও সার্বিক বৈষম্য।

ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে এ ধরা ধামে এলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু অালাইহি ওয়া সাল্লাম, যার আবির্ভাব বদলে দিল সমাজকে, বিতাড়িত করল অজ্ঞতা ও অন্ধকারকে।

৫৭০ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ সোমবার মক্কার কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাবা আবদুল্লাহর গৃহে ও মা আমেনার গর্ভে জন্ম নিলেন সেই কালজয়ী মহামানব, জন্মমাত্র ঘোষণা দিলেন সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদের। কিন্তু জন্মের কয়েকমাস পূর্বেই হারালেন পিতাকে আর ছয়বছর পর হারালেন করুণাদায়িনী মাকে। এতিম বালক নবীজির লালন পালনের দায়িত্ব আল্লাহ পাক কখনো মা হালিমা বা দাদা আব্দুল মোত্তালিব বা চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে সম্পাদন করিয়ে নেন।

পার্থিব কোন শিক্ষালয়ে যেতে হয়নি নবীজিকে, কারণ স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত  জ্ঞানে জ্ঞানান্বিত হন তিনি; হন অনুপম চরিত্রের ধারক-বাহক, “আল আমিন” বলে সম্বোধিত হতেন সেই বাল্যকাল থেকেই। এভাবে একদিকে নির্জনে খোদার জ্ঞানে জ্ঞানার্জন, নিজেকে আলোকিতকরণ, অন্যদিকে জনবহুল মানব সমাজে নিজ চরিত্রমাধুর্য  বিচ্ছুরণের সাথে সাথে চাচার ব্যবসাসহ যাবতীয় কাজে সাফল্য ইত্যাদির মাঝে পরিণত বয়সে পরিণত হলেন সৌন্দর্যে অপরূপ নবীজি।

পরবর্তী সময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বিবি খাদিজার সাথে। সুন্দর আদর্শময় পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলের অনুপম দৃষ্টান্ত। পরে অবশ্য একাধিক বিবাহ বন্ধন হলেও সাম্য ও প্রেমের মাঝে কাটত তাঁর দাম্পত্য, যদিও অভাব অনটনে পূর্ণ ছিল তাঁদের সংসার। সৃুন্দর পারিবারক জীবন, ভ্রাতৃত্বের সামাজিক জীবনের অধিকারী নবীজির ছিল সমসাময়িক ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক প্রভৃতি ছিল জয় করেছিল আরবের আবালবৃদ্ধবণিতার মন।

ন্যায়বিচার, অনুপম আদর্শ, সত্যবাদিতা ইত্যাদি সকলের মন জয় করলেও আল্লাহর একত্ববাদের কথা, ইসলামেরর কথা বলার পর পর মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া বেশীরভাগই করলো বিরোধিতা। বাড়তে থাকে আবু জেহেল, লাহাবদের চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র। এরকম ষড়যন্ত্রেও অবিচল নবীজি চালিয়ে যান পাথরকে ফুল, কাঁটাকে পাপড়ি হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর একত্ববাদ, কুরআনের আয়াত সংরক্ষণ ইত্যাদির পর ৪০ বছর বয়সে নবুয়তপ্রাপ্ত হন। এদিকে সমগোত্রীয়দের বিরোধিতা শারিরীক নির্যাতনে রূপ নিলে আল্লাহর নির্দেশে হিযরত করেন মদিনায়, সাথে জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে সর্বাবস্থায় ছিলের নবীর পরে শ্রেষ্ঠ মানব হযরত আবু বকর।

শান্তির শহর মদিনায় সুশীল শান্ত মদিনাবাসী সানন্দে গ্রহণ করলেন নবীজিকে এবং ইসলামের দাওয়াতকে। স্বীয় মহত্ত্বে মন জয় করে মদিনাবাসীদের সাথে নিয়ে করলেন পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইসলামের ও একাত্ববাদের বার্তা। বিরুদ্ধবাদীদের সাথে তায়েফ, বদর, ওহুদসহ বিভিন্ন প্রান্তরে লিপ্ত হন সম্মুখ যুদ্ধে। বীরসেনানীবেশে জয়ী হন প্রতিটিতে, তাঁর নেতৃত্ব, যোগ্যতা আর ঈমানী চেতনা দিয়ে। যুদ্ধ বিজয়ের পর সংখ্যালঘুদের প্রতি নবীজির অকৃত্রিম সম্মান ও দয়াপরবশ ব্যবহার জয় করেছে সবার হৃদয়।
অপরদিকে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সম্পন্ন করেন ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়। অতপর ইসলামের বিজয় বিস্তৃত হতে লাগলো মহাদেশ থেকে বহির্বিশ্ব সব স্থানে।

এদিকে রাষ্টপ্রধান হয়েও দরিদ্র জীবন যাপন করে আদর্শ রাষ্টপ্রধান, ক্রীতদাসকে পুত্রের মর্যাদা দান করে মানবতা সর্বোচ্চস্তরে উড্ডীন করা, নারীর সম্মানপ্রদান করে তাদের মি-বোন-স্ত্রীর মর্যাদাদান, নারীপুরুষ সকলের জন্য জ্ঞানার্জন অবশ্যম্ভাবী কের দিয়ে শিক্ষাবিস্তার, মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করে একই রাষ্ট্রে সকল ধর্মের সমান সম্মানে বসবাসের সুযোগ প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে সরবকালের শ্রেষ্ঠ রাষ্টপ্রধান, সামাজিক ক্ষেত্রে মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ, হত্যা, রাহাজানি ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্করক, নারীর সম্মানপ্রদান, দরদী প্রতিবেশি, সফল পিতা, প্রেমময় স্বামী ইত্যাদি বহুগুণের একক অধিকারী হন নবীজি।

ঐশী গ্রন্থ আল কোরআন নাযিল, মেরাজ গমন, চাঁদ দ্বিখন্ডিতকরণ, পশুর মুখে বোধগম্য হয় এমন ভাষা ফুটানো প্রভৃতির মাধ্যমে বাতিলদের জবাবদান, তাওয়াজ্জুহপ্রদানের মাধ্যমে হযরত উমরের রাগকে প্রেমে রূপান্তর, হযরত উসমানের বিস্মৃতিকে বিস্ময়কর স্মৃতিতে রূপান্তর করার মত অসংখ্য মোজেজা প্রদর্শন করে পার্থিব ও অপার্থিব জ্ঞানের আধার নবীজি এ মহামানব ঘোষণা করেন – আমিই জ্ঞানের শহর।

অবশেষে মানব জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত, ব্যক্তিগত জীবন থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে ইসলামী রূপরেখা প্রদর্শন করে সহজ অথচ ফলপ্রসূ ইসলামী বিধান বা ব্যবস্থা প্রতিষ্টিত করে বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে সে পরিপূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়ার কিছুকাল পর ৬২২ সালের ১২ রবিউল আউয়াল এ ধরাধাম থেকে বিদায় নেন।

আজ রবিউল আউয়ালের ১ম দিবসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের আদর্শ স্মরণ করে তাঁর উপর অসংখ্য দরুদ পেশ করছি।

মোঃ নাজিম উদ্দিন
nazim3852@gmail.com
চট্টগ্রাম
১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি

130 COMMENTS