মরেইতো যাবোঃ প্রসঙ্গকথা

0
20

মরেই তো যাবঃ প্রসঙ্গকথা

মানুষ বড় অদ্ভুদ জায়গা। আরো অদ্ভুদ মানুষের চিন্থা ধারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিগত কয়েকদিন ধরে মৃত্যু নিয়ে যে কয়েকটা শব্দ অতিপ্রচলিত ও অতি আলোচিত হয়ে আসছে, তা বলাই বাহুল্য। গড্ডলিকাপ্রবাহ প্রবাহের এ ধারায় আমরা গা ভাসিয়ে কত আনন্দই না পাই! সে অমোঘ বাস্তবতা মৃত্যু নিয়ে নিজের অল্প জ্ঞান ও কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টায় আছি! মরেই যখন যাব..!

বয়স তখন সম্ভবত ১২/১৩। রাউজান মোহাম্মদপুর স্কুলে অধ্যয়নরত। সহপাঠী মাসুদও নিয়মিত ছিল। “স,” জ” ইত্যাদি উচ্চারণে তার সমস্যা ছিল; সবাই a,b,c,d বললেও মাসুদের উচ্চারণটা a, b,d,d এরকম ছিল। হাসির পাত্রও হত অনেক জায়গায়, আমাদের দুরন্ত শৈশবে। হঠাৎ এক মরণব্যাধী কেড়ে নিলো মাসুদের জীবন, মাত্র ৭ম শ্রেণিতে পড়াকালীন! পাশের বাড়ির (বর্তমান ব্রাইট সোস্যাইটি ক্লাব অফিসের পাশে) গোরস্তানে শায়িত মাসুদের কত স্বপ্নই হয়ত ছিলো!

বাড়ির বড়ভাই খোরশেদ। টকবগে তরুন।বিদেশে পাড়ি জমান জীবিকার সন্ধানে। বিদেশভূমিতেই হঠাৎ মৃত্যু! লাশ বহনে ব্যবহৃত আসা কফিনের বক্স মক্তবে যতদিন ছিল, ততদিন শৈশব মনে কত ভীতিই না জমাত!

খুলন পন্ডিতের বাড়ি নিবাসী বন্ধু পারভেজ। স্কুলজীবন থেকেই বন্ধুবৎসল, দুরন্তও। রাউজান কলেজে একসাথে পড়েছি উচ্চ মাধ্যমিক। রাউজানে তখনকার প্রচলিত বিনোদনমাধ্যম মেহেদীরাতের “প্যাকেজ অনুষ্টান” মাতিয়ে রাখত সরলমনা পারভেজ। হঠাৎ এক দুরারোগ্য রোগে অাক্রান্ত হয়ে সুস্বাস্থ্যবান পারভেজ পরপারে চলে গেলো, বয়স হয়ত তখন ২০/২২!

উত্তর বাড়ির সেকান্দর চাচার মাহাবুব ফুটবল মাঠে কতই না মাতিয়ে রাখত শৈশবের রুটিনবিহীন দিনগুলোতে! বিবাহ সম্পন্ন করবে জানলাম। এ উদ্দেশ্যে কনেও ড়েখা হচ্ছিল। একদিন শহরে যাওয়ার পথে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যায় মাহবুব! সব ইচ্ছেই যেন গুড়েবালি!

বন্ধু সাদেক। রাউজান কলেজের বন্ধু। কিছুটা হৃদরোগাক্রান্ত ছিল সুঠাম দেহের ভদ্র যুবকটি। গত বছর হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই নিল শেষ নিশ্বাস! জানাজা পড়তে না পারার আক্ষেপ ঘুচালাম রাউজান সদরে তার পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে জেয়ারত সম্পন্ন করে। তাদের নবজাতকটা তখনও পৃথিবী দেখেনি!
ছাত্র জাহিন। ও লেভেল পড়ার সময় পড়াতাম খুলশী তাদের বাড়িতে। গত বছর পত্রিকায় দেখলাম ঢাকায় নিজে গাড়ি ড্রাইভ করার সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যায় দিদার দিদার ভাই ও ফ্লোরা আপার দুরন্ত বালকটি!

শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, বর্ষীয়ান রাজনীতিক, জনাব আবুল কালাম আংকেলের বড়পুত্র ইশতিয়াক কালাম চৌধুরী। কলেজিয়েট, নটরডেম পারি দিয়ে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (খুয়েট) এ মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ সম্মান  শেষবর্ষে অধ্যয়নকালীন হঠাৎ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়ে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে বিমর্ষ করে দেয় বাবা দক্ষিণ জেলার বর্ষীয়ান রাজনীতিক মুক্তিযোদ্ধা জনাব আবুল কালাম চৌধুরীসহ আপনজনকে। মৃত্যু এমনই। গানের কথায়-
টাইম হইলে যাইতে হইবে, যাওয়া ছাড়া নাই উপায় কিংবা এক সেকেন্ডের নাই ভরসা…!

আবদুল্লাহ আল মামুন চাচা।  নিজে গাড়ি চালিয়ে বাসায় আসার ৫০/৬০ গজ দূরেই নিজ গাড়িতে আকস্মিক মৃত্যুকোলে ঢলে পড়লেন, ২০০৮ সালের জানুয়ারীর এক সন্ধ্যায়। যাওয়া হলো না তুহিন আপুর মেহেদি সন্ধ্যায়! আশে পাশে অকালে, আকস্মাৎ কত জন কাছের মানুষ মুহূর্তেই মৃত্যুর কৃষ্ণ গহবরে চলে গিযেছে-তার তালিকা অনেক দীর্ঘ, অনেক! আল্লাহর কাছে সব মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাউত, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’।
“Every soul shall taste death.” Holy Qur’an :29:57
“Wheresoever you may be, death will overtake you even if you are in fortresses built up strong and high!” Qur’an 4:78

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসও যেমনটি বলেছেন, The hour of departure has arrived and we go our ways; I to die, and you to live. Which is better? Only God knows.
(সক্রেটিস  ৪৬৯ – ৩৯৯ খ্রীঃ পূর্বঃ)।

বিশ্ববিখ্যাত কবি ও নাট্যকার উইলিাম শেক্সপিয়ারের ভাষায়,
All that live must die, passing through nature to eternity.

কোরআনে কয়েক স্থানে মওত ও হায়াত-এই ক্রমে বর্ণনা এসেছে। হায়াত নির্ধারণের সময় মৃত্যর সময়ক্ষণ নির্ধারিত।

আমাদের এ মৃত্যু আমাদের গমন বা যাত্রা নয়, বরং ফিরে ফিরে যাওয়া। পবিত্র কোরআনে ৩০ বারেরও অধিকবার “রাজেউন” প্রকৃতির শব্দ দিয়ে বলা হয়েছে, “ফিরে যাওয়ার কথা”…? সারকথা,…. ‘তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে…..তার অর্থ হচ্ছে, আমরা একটা স্থানে ছিলাম, লাওহে মাহফুজ, আলমে খালক, হাকিক্বত জগত, আলমে আমর (আদেশ জগত) হয়ে এ মাটি-পানি-আগুন বাতাস নামক উপকরণ দিয়ে তৈরী জৈবিক শরীর নির্দিষ্ট পরিক্রমায় পৃথিবীতে এসে পুনরায় মৃত্যুর পর কবরকালীন আলমে বরযক হয়ে নিজের home-ground এ ফিরে যাবে, আজ বা যেকোন দিন-যেদিন বেঁধে দেয়া সময়সীমা পরিপূর্ণ হবে তার।

আসার সময় আমাদের একটা বয়সক্রম বা জ্যেষ্ঠতা থাকে, দাদার পর বাবা আসে, বাবার পর সন্তান। কিন্তু “ফিরে যাওয়া” সময় কোন বয়সক্রম বা জ্যেষ্ঠতা মানা হয় কী?
আর সেটাই জীবনের উপর মৃত্যুর চ্যালেঞ্জ!

Lord Alfred Tennyson এর কবিতায় Tithonus এর জন্য তার প্রেমিকা Aurora দেবতাদের কাছ থেকে অমরত্ব অনুমোদন করার গ্রীক পুরাণের গল্পটা বেশ মজার! কিন্তু অমর যৌবনের কথা তাতে বলা না থাকায় বার্ধক্যের যাতনায় Tithonus নিজেই মৃত্যু প্রার্থণা করছিলো! কী বিষাদময়তা!

সবার ক্ষেত্রে সত্য হলো, মরেই তো যাব! এ কথা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলো যুবকটি। পরক্ষণেই কী এক কাকতালীয় মর্মান্তুক সড়ক দুর্ঘটনায় গত পরশু চট্টগ্রাম বালুচরায় মারা যায় বিশ / বাইশ বছরের তরুণটি! আহা!

মূল কথা হলো, মৃত্যু অমোঘ। আসল বিষয়টি হলো, পরীক্ষাক্ষেত্র দুনিয়ার প্রতিক্ষণ কে, কীভাবে কিংবা কত গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে পরপারের জবাবদিহিতায় উত্তরণে রবের করুণা প্রার্থণার উপযোগী হব!আর চূড়ান্ত সফলতা শুধুমাত্র তাতেই…

——–


মোঃ নাজিম উদ্দিন
nazim3852@gmail.com
২৯ মার্চ ২০১৮