মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো’- বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা

Sep 10, 2023 | গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস, স্বাস্থ্যঃ শরীর মন মনস্তত্ব | 0 comments

Post View : 1
 

মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো’-

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা

———

আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO এর হিসাব মতে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা (suicide) করে।
সমাজকল্যাণ সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের মতে,
গড়ে প্রতি মাসে ৪৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২১ সালে মোট ১০১ জন এবং ২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি; আলোচ্য সময়ে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৯.৩০ শতাংশ।
আত্মহত্যার যেসব কারণ চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো হলোঃ অভিমান, প্রেম ঘটিত ব্যাপার, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, একাডেমিক চাপ, মানসিক অস্থিতিশীলতা, পারিবারিক সমস্যাসহ আরও বিভিন্ন বিষয়।
আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পিছনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পিছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী অভিমান। অভিমানের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ৩১.৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী।

(সূত্রঃ দৈনিক বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ড: ১০-৯-২৩)

ইসলাম কি বলেঃ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা আত্মহত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর করুণাময়।’ সুরা নিসা, আয়াত : ২৯।

ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের পূর্বেকার এক লোক আহত হয়ে সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি। তাই একটি চাকু দিয়ে নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলে। এরপর রক্তক্ষরণের কারণে মারা যায়। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারে বড় তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। তাই আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি: ৩২৭৬; মুসলিম: ১১৩

মনিষিদের বাণীঃ
১) আত্মহত্যা জীবনে সবচেয়ে বড় কাপুরুষতার পরিচয়। নেপোলিয়ন বেনাপোর্ট
২) সভ্যতাগুলো আত্মহত্যার মাধ্যমেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, হত্যার কারণে নয়।
— আরনোল্ড টয়েনবি।

করণীয় কি হতে পারেঃ

১) যখনই আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দিবে, তখন সবার আগে নিজেকে যেটা বলা জরুরী সেটা হচ্ছে, প্রতিটি খারাপ সময়ের শেষ আছে এবং এক সময় ভালো সময় শুরু হবে।।
২) আমাদের দেশে আমরা মানসিক চাপকে গুরুত্ব দেই না কখনোই। কিন্তু এই মানসিক চাপ একসময় বড় ক্ষতির কারণ হয়। সুতরাং যখনই মানসিক চাপ অনুভব করবেন, চেষ্টা করুন নিজেকে খুশি রাখতে। এ চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে।

৩) যখনই মনে হবে বেঁচে থেকে লাভ নেই, তখনই নিজের চারপাশে তাকান। পরিবারের কথা ভাবুন, বন্ধুদের কথা ভাবুন। আপনার মনে হতে পারে কেউ আপনার কেয়ার করে না। কিন্তু একটু ভালো করে ভাবলেই দেখতে পাবেন আপনার আশেপাশে অনেক মানুষ আছে যারা আপনার কথা ভাবে, আপনাকে কেয়ার করে, ভালোবাসে। তাদের কথা চিন্তা করুন। আপনি মারা গেলে তাদের কতটা কষ্ট হবে সেটা ভাবুন।

৪) অপরাধবোধ থেকে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক বেশি। তাই যেটা আপনি করেননি বা আপনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ নেই সেটার জন্য নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন।
৫) নিজের জীবনের দিকে তাকান। সাধারণত অল্প বয়সীরাই আত্মহত্যা প্রবণতায় বেশি ভোগে। সুতরাং ভাবুন ভবিষ্যতে কী কী করা বাকি আছে আপনার। কী কী আপনি করতে পারেননি। আত্মহত্যা করলে কখনোই আর সেগুলো করার সুযোগ পাবেন না।

৬) যদি মনে হয়, যে এভাবে হচ্ছে না। কোনভাবেই নিজেকে নিজের মানসিক চাপ থেকে বাঁচাতে পারছেন না, দিন দিন আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, তাহলে একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট, যিনি আপনার জীবন পাল্টে দিতে সাহায্য করতে পারবেন। তার সাথে সব শেয়ার করুন, তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন।

৭) সকল ধরণের নেশা জাতীয় দ্রব্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নিন। খারাপ অভ্যাস ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করুন।
৮) ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন।
৯) সবশেষে নিজের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পূরণ করার চেষ্টা করুন। দেখবেন সবকিছু আস্তে আস্তে সহজ হয়ে আসছে। আত্মহত্যা কখনোই সমাধান নয়, নিজেকে রক্ষা করুন এবং অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠুন।

সবশেষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বোঝাপড়া” কবিতার কিছু অংশ উল্লেখ করলামঃ

তোমার মাপে হয়নি সবাই ।
তুমিও হও নি সবার মাপে,
তুমি মর কারও ঠেলায়
কেউবা মরে তোমার চাপে –
তবু ভেবে দেখতে গেলে
এমনি কিসের টানাটানি ?
তেমন করে হাত বাড়ালে
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি ।
আকাশ তবু সুনীল থাকে,
মধুর ঠেকে ভোরের আলো,
মরণ এলে হঠাৎ দেখি
মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো ।
…….
………
নিজের ছায়া মস্ত করে
অস্তাচলে বসে বসে
আঁধার করে তোল যদি
জীবনখানা নিজের দোষে,
বিধির সঙ্গে বিবাদ করে
নিজের পায়েই কুড়ুল মার,
দোহাই তবে এ কার্যটা
যত শীঘ্র পার সার ।
খুব খানিকটে কেঁদে কেটে
অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া
মনের সঙ্গে এক রকমে
করে নে ভাই, বোঝাপড়া ।

তাহার পরে আঁধার ঘরে
প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তোলো –
ভুলে যা ভাই, কাহার সঙ্গে
কতটুকুন তফাত হল ।
মনেরে আজ কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যরে লও সহজে ।”

“Life is better than death.”
Alice Walker..


রচনা ও সংকলনে
মোঃ নাজিম উদ্দিন
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

(লেখাটি ইচ্ছে হলে শেয়ার করতে পারেন)