বিচ্ছিন্ন ভাবনাঃ “নিজে”কে জানি, “নিজে”কে মানি

0
39

বিচ্ছিন্ন ভাবনা:
নিজেকে জানি: “নিজে”কে মানি
*****

আমি কে? আমি কী? কী আমার পরিচয়? কোথা হতে এসেছি?
কোথায়-ই বা যাবো?

এ সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেই আমরা আমাদের চিন্তা, কর্ম ও বাক্য সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি।
নিজেকে চিনতে পারার মাঝেই সার্থকতা জীবনের।

নিজেকে, নিজের সক্ষমতা, দুর্বলতা, নিজের সুযোগ আর আশঙ্কা ইত্যাদির ব্যাপারে নিজের সজ্ঞানতা বা অজ্ঞতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকার অর্থই নিজেকে ভালোভাবে জানা।

বৈদিক যুগের ঋষিরা “আত্মনং সিদ্ধি” অর্থাৎ নিজেকে জানার কথা বলেছিলেন। ধ্যানমগ্ন হওয়ার আত্মমুখ পদ্ধতি কিংবা ব্যবচ্ছেদ নামের বিষয়ময় পদ্ধতির মধ্যে মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে খুঁজে না পেয়ে নিজেকে জানার জন্য প্রাগৈতিহাসিক গুহায় গুহামানবের মস্তিষ্কের খুলি অনুসন্ধান করে পৃথিবীতে সচেতন অস্তিত্ব এর হদিস পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সিদ্ধা ও তান্ত্রিকরা কায়াসাধনাও করেছেন। মানুষ তার দেহের অস্তিঃসন্ধি জেনে চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্ম দিয়েছেন এবং দেহ ও মনের চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।

এই মানবদেহের অন্যতম বিস্ময় মস্তিস্ক। প্রায় এক সহস্র কোটি একক স্নায়ুকোষ বা নিউরন নিয়ে গঠিত এই মহাকেন্দ্রে অসংখ্য যোগাযোগ পথ, বিশ্লেষণ কেন্দ্র ও রয়েছে একটি বিরাট আকার স্মৃতিভান্ডার। যার ওজন মাত্র ১২০০ থেকে ১৫০০ গ্রাম।
(সূত্র: বাংলা একাডেমি প্রকাশিত হুমায়ুন কে, এম, এ হাই রচিত “মানবমস্তিষ্ক”)।

সহস্র বছরেরও আগে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের একটি কথা অনেকেরই জানা: ‘Know thyself’ অর্থাৎ, নিজেকে জানো। তারও অনেক বছর পর পরিত্র কোরানে বর্ণনা এসেছে, ‘মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’ অর্থাৎ যে নিজেকে চিনেছে, সে খোদাকে চিনেছে।

“অতঃপর আমরা তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, জমাট বাঁধা রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণ আকৃতি ও অপূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট গোশতপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। আর আমরা নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর শিশু অবস্থায় বের করি’ (আল কোরআন, সূরা হজ্জ ২২/৫)।

নিজের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মানুষ SWOT (Strength, Weakness, Opportunity & Treat) analysis করলেও নিজেকে নিয়ে কয়জনই না তা করে? নিজের চেতন, অবচেতন ও অধিচেতন- এই তিন অবস্থা থেকে মানুষ নিজের সম্বন্ধে জেনে এগিয়ে যায়। আরবিতে “এজতব্দেকা আন কলবেকা”- বা ‘নিজের অন্তর থেকে শিক্ষা নেয়া’র শিক্ষা থেকে সুফিবাদের ভাষায় মোরাকাবা বা ধ্যান, মনদৈহিক বা মনজাগতিক ভাষায় মেডিটেশন এর উদ্ভব।

এই বিস্ময়কর মস্তিষ্কের কতভাগ আমরা ব্যবহার করতে পারি- তা জেনে আঁতকে উঠবেন! যে সব মানুষ অধিক চিন্তা করেন, তারা মস্তিষ্কের ১০ ভাগ ব্যবহার করেন। এই পর্যন্ত ১০ ভাগের বেশি ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ।

এ নিয়ে ছোট একটি রম্য-কল্প-গল্প বলা যাক। একবার এক বাংলাদেশী জানতে পারলো, তার শহরে মস্তিষ্ক ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। সে সেখানে গেল। দেশ ওয়ারী বিভিন্ন স্টল দেখে ভাবল, উন্নত দেশগুলোর মানুষের মস্তিষ্কের দাম আগে দেখা যায়-সে ভাবল, এই মস্তিস্ক ব্যবহার করতে পারলে সে সব উন্নত দেশের মানুষের মত উন্নত হতে পারবে!
মেলায় আমেরিকার স্টলে প্রতিটি মস্তিষ্কের মূল্য ছিল খুব কম! তার পর চীনের স্টলে গিয়ে আরো আশ্চর্য! দাম আরো কম! চীনা মস্তিষ্ক বলে হয়ত! তারপর হাঁটতে হাঁটতে নিজের
দেশের স্টলে গেল। প্রথমে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি! সবচেয়ে বেশি দাম তার স্বদেশী মানুষের মস্তিষ্কের ! কৌতূহল তার মিটল তখনই যখন জানতে পারলো, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ নাকি বাংলাদেশীরা মস্তিষ্ক খুব কমই ব্যবহার করে!!!!

ভাবুন, নিজেকে জানুন, নিজের ইতিবাচক আর নেতিবাচক বিষয়ে জানুন; জীবন কি জানুন; জানুন দুনিয়া কি তা ও! যে জগৎ থেকে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে হবে বলে “রাজেউন” শব্দ কোরানে যে হরেকবার প্রত্যাবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়, তা নিয়ে ভেবে দেখুন,
কোথা থেকে আসা? কেনই বা আসা? কোন গন্তব্যে ছুটে চলা?

এই ‘কাল’ কি গন্তব্য,
নাকি মূল গন্তব্যে পৌঁছানোর সড়ক মাত্র?

—-
মোঃ নাজিম উদ্দিন