বাংলাদেশে খুঁজি অস্তিত্ব

83
23

বাংলাদেশে খুঁজি অস্তিত্বঃ পর্ব ১

সময়টা ১৯৯৭ সাল। আইসিসি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। সম্ভবত সেমিফাইনালে বাংলাদেশের
প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড। এ একটি ম্যাচ জিততে পারলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলার স্বর্ণসুযোগ পাবে- ভাবতেই গা শিহরে উঠছিল।
তখন টেলিভিশনে সব ক্রিকেট ম্যাচ সম্প্রচার করা হতো না বা গ্রামে দেখার সুযোগ ছিলোনা।
উত্তেজনা আর প্রত্যাশায় সারাদেশের ক্রীড়ামোদিরা। টান টান উত্তেজনা যাকে বলা হয়।
অবশেষে খেলায় জিতলো। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলবে! সে কী গর্ব! সে কী উম্মাদনা! সে কী শ্লোগান! তারপর সে কী মিছিল!

স্বপ্ন তখন আকাশ চুম্বে। ফাইনালে প্রতিপক্ষ কেনিয়া। ঝাঝালো মরিচ উদুম্বে, শ্যামবর্ণ স্টিভ টিকালো কিংবা থমাস উদয়ে নামগুলো মুখস্থ। আরেক দু’জনকেও বুঝি, সে হলো মার্টিন আর টমি সুজি! লাল সবুজের পক্ষে আকরাম খান, মনি, নান্নু, দুর্জয়, জাবেদ, শান্ত, বুলবুল, সুজন, রফিক প্রমুখ টাইগারেরা।
আগেই বলেছি, গ্রামে ক্রিকেট উপভোগের প্রধান বা একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিওতে ধারাভাষ্য অনুসরণ করা। ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ, জাফর উল্লাহ শরাফত, খোদা বক্স মৃধারা জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

এলাকার বড় ভাই আর বন্ধুরা মিলে ভাড়া করা হল ব্যাটারিচালিত মাইক। বাড়ির সামনের খেলার মাঠের ঠিক মাঝখানেই বাঁশে লাগানো হলো মাইক। প্রিয় রাউজানের মোহাম্মদপুরের সে সময়ের ”গান্ধী স্টেডিয়াম” নামে খ্যাত খেলার মাটটি যেন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের ক্রিকেট স্টেডিয়াম! ম্যাচ শুরু হলো। সে কী উত্তেজনা। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ২৫ ওভারে ১৫০ রান দরকার।

টানটান উত্তেজনা শেষ ওভারে। ৬ বলে ১১ রান দরকার। প্রতি বলে উম্মাদনা, উৎকন্ঠা, টেনশন! অবশেষে হাসিবুল হোসেন শান্তের ব্যাটে চুড়ান্ত বিজয়ে বাঁধভাঙা আনন্দে শুরু হলো মিছিল। কর্দমাক্ত মেটো পথে গ্রামের অলিগলিতে ঘুরেছে সে মিছিল! একটা শব্দের ঝংকারে মুখরিত-“বাংলাদেশ, বাংলাদেশ “..
এ আনন্দে ছিলোনা কোন দল-মতের আদর্শের সীমাবদ্ধতা, কোন বর্ণ-ধর্ম-গোত্রের পরিচিতি। সে মিছিলে যুক্ত ছিলো কৃষাণ, ছাত্র, শিক্ষক, মসজিদের মোয়াজ্জিন, হিন্দু বাড়ির গণেশ, পঙ্কজেরা, দোকানদার আর অনেকে! যেন ভিন্ন ভিন্ন স্রোত দেশপ্রেমের এক আবেগাপ্লুত উম্মাদনার মোহনায় মিলে একাকার।

এর পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেললো বাংলাদেশ। বিজয় চিনিয়ে এনেছে প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান দলের সাথে অনুষ্টিত ম্যাচে! সে কী আনন্দ! ইমরান খানদের পাকিস্তানকে পরাস্ত করে ক্রিকেটে পরাশক্তি হিসেবে নব্য দল ‘বাংলাদেশ’ এর। তার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শুধু খেলতে মাঠে নামেনা: তারা বিজয় চিনিয়ে আনে, উড্ডীন হয় বিজয় পতাকা।
সারাদেশ সে রাতে শুনেছে বাংলাদেশের মানুষের মিছিলের গর্জন: এ গর্জনে কেই গলা ফেটে চিৎকার করছে, কেউ খুশিতে কোলাকুলি করছে আর কারো চোখে আনন্দাশ্রু! এ অশ্রু কোন স্বার্থের প্রত্যাশায় নয়: এ যেন প্রিয় স্বদেশকে স্বপ্নের মঞ্চে দেখার নির্মোহ বাসনার বহিঃপ্রকাশ।

নিজের শৈশবেই যেন রচিত হয়েছিল
সে দেশমুখী ভালোবাসার গল্প- কবিতা। এ ভালোবাসায় কোন দলাদলী নেই, নেই সংকীর্ণতার নগ্নচাপ।

ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে লাগলো প্রিয় দলের নাম, প্রিয় তারকার নাম। এককালে শহীদ আফ্রিদি বা আমির সোহেলে বুদ হয়ে যাওয়া উম্মাদনা
ঘুরে ফিরলো মাশরাফিতে। কপিল দেব, সৌরভ-শচীনদের ক্ষেত্রেও তাই। ক্রিকেট মানেই বাংলাদেশ: দল হিসেবে অন্য দেশকে সমর্থন দেয়া ভুলে গেছে বাংলাদেশীরা। বিশ্বকাপ হাতে পেয়ে মিছিল করার স্বপ্নে শুধু মাঠের ১১ জনই নয়, বরং ১৭ কোটি বাঙালীর ৩৪ কোটি হাত।
এভাবে ক্রিকেটে বাংলাদেশ কৈশোর পেরিয়ে নব যৌবনে রেখেছে বাংলাদেশ, রেখেছে সাফল্যের চিহ্নও, এনেছে ঐক্য, দেশপ্রেম।

কর্মে ব্যস্ততার পরও বাংলাদেশের খেলা মানে এক পরম মুহুর্ত। কাজের ফাঁকে cricbiz লাইভ।

তবে কিছু ক্ষেত্রে কমলেও হারায়নি সে সব মিছিলগুলো! পাগলের মত ম্যাচশেষে মিছিলে দৌড় দিয়ে চিৎকারে দেশের নামটা আকাশ ফাটানোর উম্মাদনাগুলো! পরের দিন পত্রিকায় খেলার কলামের সে সব শব্দগুলো!
ইচ্ছা করে শৈশবের ভাষায় চিৎকার করতে চায় অনেক যুবা, প্রৌঢ়ও: ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ..”

এ ক্রিকেট আমাদের শিখিয়েছে এক অভূতপূর্ব ঐক্য, দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এক মঞ্চে, এ সাগরের সৈকতে এনেছে এ ক্রীড়াই।
ম্যাচের শুরুতে জাতীয় সংগীতে হৃদয়-মন কেঁদে উঠে বাঙ্গালীর, বাংলাদেশির: ম্যাচ শেষে যেন লাল সবুজের পতাকার মাঝে বিজয় মুকুটের স্বপ্ন দেখে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সকল বাংলাদেশি।

এ যেন যে কোন দুঃসময়ে নিয়ে আসতে পারে মু্ক্তিসেনার ১৯৭১, এ যেন বয়ে আনতে পারে নব নব আবিষ্কারের প্রেরণা, এ যেন কৃষি, মৎস্য, শিল্পায়নে আনতে পারে সর্বোচ্চতার রেকর্ড: রঙিন বিজয়।

এ দেশ আমাদের অস্তিত্বের মূল শেকড়ে, ঐক্যমত্তার এক মিনার। এ যেন সবার কাছে ব্যর্থ হয়ে নিজ অর্থায়নে নিজ প্রযুক্তিতে সুবিশাল পদ্মাসেতু নির্মাণের সাহসি জয়যাত্রা; এ যেন তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের সম্মান।

এ লাল-সবুজের পতাকায়, এ জাতীয় সংগীতের মুর্ছনায়, রণ সংগীতের দ্যোতনায় মিলিত হয় বিজয় নিশান; বিজয় প্রত্যয়। এ যেন দুঃসময়ে সময়, হতাশায় সাহস, নির্জীব অঙ্গণে একতা, অস্তিত্বহীনতায় খুঁজে পাওয়া প্রিয় ঠিকানা-
বাংলাদেশ, বাংলাদেশ–

———————-
মোঃ নাজিম উদ্দিন

83 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here