Home গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস পরীক্ষার ফরম ফিল আপ ও প্রবেশপত্রঃ কিছু কথা

পরীক্ষার ফরম ফিল আপ ও প্রবেশপত্রঃ কিছু কথা

0

পরীক্ষার ফরম ফিল আপ ও প্রবেশপত্রঃ কিছু কথা

স্কুল বা জীবনে বার্ষিক পরীক্ষা বা অন্য যে কোন পরীক্ষার পূর্বে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণঃ ফরম পূরণ বা ফরম ফিল আপ, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রবেশপত্র সংগ্রহ এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ। তবে আর্থিক সামর্থবান পরিবারের সন্তানদের প্রথম দুটি নিয়ে ভাবতেই হতো না বা হয়না। কিন্তু যারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, তাদের জন্য এবং তাদের সন্তানদের জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়ে এডমিট কার্ড সংগ্রহ করা ছিলো পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার চেয়েও অধিত গুরুত্বের, কারণ এডমিট কার্ড না পেলে প্রস্তুতি নিয়ে কী লাভ।
আমাদের স্কুল জীবনেও এ ‘এডমিট কার্ড’ সংগ্রহ করাটাই আমার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আবারো বলে রাখা ভালো, স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের কাছে এ কথাগুলো তেমন আবেদন না ও রাখতে পারে।

আর্যমৈত্রেয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যযনকালীন এ সমস্যা ছিলোনা। উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশেষ করে, ৬ষ্ট থেকে ৯ম শ্রেণিতে যেটা হতো, প্রথম সাময়িক ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় বেতনের সবটুকু পরিশোধ না করলেও মোট বকেয়ার একাংশ পরিশোধ করলেই কোন রকমে, জোর অনুরোধে প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করা যেতো। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষায় তা ছিলো অনেকটা অসম্ভব।

প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক (প্রথমটাকে ছোটবেলায় ‘ছমাসি পরীক্ষা এবং দ্বিতীয় সাময়িককে ‘নমাসি পরীক্ষা’ বলা হতো) এমনও সময় ছিলো, স্কুলের হিসাব শাখা থেকে প্রবেশ পত্র না পেলেও কোনসময় আমাদের মোহাম্মদপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনিল কৃঞ্চ স্যার বা সহকারি প্রধান শিক্ষক স্বপন স্যার, মাঝে মাঝে সন্তোষ স্যারের কাছ থেকে বা আবদুস সালাম হুজুরের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা প্রবেশ পত্র নিয়ে পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশ করার অভিজ্ঞতাও ছিলো। আবদার-অনুরোধ করে ‘ম্যানেজ’ করার গল্প দাদাকে বলতাম।

কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষার সময় এ আবদারে আর হতো না। হয়তো পরীক্ষার সময় চলে যাচ্ছে দেখে প্রথম দিন অংশগ্রহণ করতে দিতেন সম্মানিত শিক্ষকগণ। কিন্তু একটা তারিখ লিখে রাখতেন, কোন তারিখে পরিশোধ করবো!

এখানে বলা উত্তম, আজ থেকে প্রায়, ৩০ বছর আগের গ্রামের আর্থসামাজিক অবস্থা ও আজকের অবস্থা এক ছিলোনা। স্কুলে তেমন দাতা, অনুদানদাতা যেমন ছিলেননা, সরকারি নিয়মিত মাসিক সহায়তাও ছিলো অর্ধেক বা অনুরূপ। শিক্ষকদের বেতনও অনেকটা নির্ভর করতো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টিউশন ফি বা অন্যান্য ফি থেকে। তাছাড়া, শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকেরও তেমন সুযোগ ছিলোনা কোন বিত্তবানের  কাছে আর্থিক সহায়তা গ্রহণের। আজকের সমাজের মতো অনেক ‘আর্থিক স্বচ্ছল বা ধনী’ মানুষের প্রাধান্য ছিলোনা বললেই চলে। মেধা, পরিশ্রম, উত্তরাধিকার, অন্যকে ঠকিয়ে বা সময়ের স্রোতে অনেকে আজ ধনী, টাকা খরচ করার সুযোগ পাচ্ছেননা এমন ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিও আছেন আজকাল কার সমাজে।

আমার পরিবারের সুযোগ ছিলো বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে দাদী মরহুম ছফুরা খাতুনের ভাইদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করার। মরহুম সালাম দাদা (মরহুম আলহাজ্ব এমএ সালাম সাহেব), মরহুম সোবহান দাদা, মরহুম নুরুল ইসলাম দাদাগণের কাছ থেকে আমাদের ৩ ভাই বোনদের বার্ষিক পরীক্ষার ফরম পূরণের অর্থ মোটামুটি জোগাড় করতে দাদী। আল্লাহর কাছে এমন পরোপকার, সত্যিকারের বিদ্যোৎসাহীদের জন্য উত্তম প্রতিদান প্রার্থণা করি।

এবার আসি, এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের পালা। তখন টেস্ট পরীক্ষার পর আজকালের মতো বাধ্যতামূলক ‘কোচিং’ না থাকলেও দশম শ্রেণির বেতনেরর বকেয়া অংশের উপর ভিত্তি করে সহ মোটামুটি ১৫০০/১৬০০ টাকা হতে ২৪০০/২৫০০ টাকা লাগতো। এ টাকা আজকের দিনে খুব নগণ্য বিষয় হলেও তখন এটা অনেক বড় এমাউন্ট। এসএসসি ফরম পূরণের সময় কিছুটা সংশয়, উৎকন্ঠা থাকলেও উপরে বর্ণিত মরহুম দাদাদের সহায়তায়, বিশেষ করে সালাম দাদার সহায়তায় আমার ফরম পূরণ করে প্রবেশ পত্র সংগ্রহে তেমন ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে শুনলাম, আমাদের এক সহপাঠী টেন্ট/নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস করলেও টাকার অভাবে ফরম পূরণ করতে পারে নি। আমরা বিষয়টা জানামাত্রই
সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কয়েকবন্ধু সাইকেল জোগাড় করি।
স্কুল তখন বন্ধ। সমাধান করার পন্থা ভাবতে লাগলাম। আমাদের সবার প্রিয় স্বপন স্যারের বর্তমান চারাবটতল সন্নিকটে স্যারের বাড়ি ছুটে গেলাম, সেই পরীক্ষার্থী সহপাঠী সহ।। স্যার তো দেখেই প্রথমে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, এই, তোরা পড়ালেখা না করে এ সময় এখানে কেন এসেছিস? স্যারকে তখন বিস্তারিত বুঝিয়ে বললাম। স্যার সব শুনে একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। সম্ভবত ন্যুনতম ফি (যে ফি শিক্ষা বোর্ডে পরিশোধ না করলেই নয়) পরিশোধ সাপেক্ষে আমাদের সে সহপাঠিকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন। সে টাকা অনেক কষ্টে কয়েকজনের কাছ থেকে জোগাড় করতে পারলো সে সহপাঠী। সে অংশগ্রহণ করতে পারবে, এ বাঁধহারা আনন্দ, পরিতৃপ্তিতে আমাদের মনে হয়েছিলো, সেদিনই এসএসসি পাস করে ফেলেছি। স্বপন স্যারও আমাদের এ উদ্যোগে খুব খুশী হয়েছেন।
আজকের দিনে হয়তো সে ৬০০/৭০০ টাকা অনেক এসএসসি পরীক্ষার্থী মোবাইল বা ইন্টাররনেট বিল পরিশোধেও খরচ করে, কিন্তু তখন এ টাকা একজন শিক্ষার্থীর জীবন পালটে দিতে পারতো!

আজ নভেম্বর শেষার্ধে, ডিসেম্বরের পূর্বে ভাবি, হয়তো আমাদের মতোই কোন গ্রামে, কোন অঞ্চলে কোন পরীক্ষার্থী বার্ষিক পরীক্ষা বা কোন পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েও ফরম পূরণের টাকার অভাবে সংকট,উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। কোন গ্রামে হয়তো সালাম সাহেবদের মতো পরোপকারি সহায়তা করছেন, কোন গ্রামে হয়তো তেমন কেউ নেই বলে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারছে না। হয়তো একই ক্লাসের বই পরের বছর পড়তে হবে…..
পরীক্ষার ফরম ফিল আপ ও প্রবেশপত্র নিয়ে পড়তে ইচ্ছুক, অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের এ উৎকন্ঠার শেষ হবে তো?


মোঃ নাজিম উদ্দিন
নভেম্বর ১৮, ২০২২

Exit mobile version