নবীদের পরে শ্রেষ্ট মানবঃ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর স্মরণ

0
62

নবীদের পরে শ্রেষ্ট মানবঃ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর স্মরণ


প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, জ্ঞানের গভীরতা, কুরআনের নীতি-জ্ঞানে পরিপক্বতা, কর্তব্য-নিষ্ঠা, জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে সমগ্র পৃথিবীব্যাপী যত রাষ্ট্রনায়ক সুখ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাঁর নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন ইসলামি খিলাফাতের প্রথম খলিফা, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। ২২ জমাদিউস সানি তাঁর ওফাত দিবস।

আরবের ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হযরত আবু বকর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের দুই বছরে কিছু বেশি সময় পরে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ইন্তেকাল করেছিলেন রাসুলের ইন্তেকালের পর একই ব্যবধানে। তাঁর বংশপরম্পরা ষষ্ঠ পুরুষে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধারায় মিলিত হয়।

তাঁর নাম ছিল আবদুল্লাহ, ডাকনাম ছিল আবু বকর, উপাধি আতিক, সিদ্দিক ও খলিফাতুর রাসুল। তাঁর পিতার নাম ছিল উসমান আর ডাকনাম ছিল আবু কুহাফা। মাতার নাম ছিল সালমা আর কুনিয়াত ছিল উম্মুল খায়ের। হজরত আবু বকর ছিলেন বেশ সুদর্শন, ব্যবসায়ী, স্বচ্ছল, সামাজিক নেতৃত্বে মর্যাদাবান। বিলাসিতার মধ্যে প্রতিপালিত হলেও তাঁর জীবনে জাহেলি যুগের নীতিহীনতা বা বর্বরতার কোনো স্পর্শ লাগেনি।

তাঁর মধুময় ব্যবহার, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সচ্ছলতা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, পরোপকার, বিশ্বস্ততা, সচ্চরিত্র, জ্ঞান, মেধা ও পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি ছিলেন মক্কাবাসী সবার শ্রদ্ধার পাত্র। অনেকে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে আগ্রহী ছিল। তাঁর বাগ্মিতা ও কাব্য প্রতিভাও ছিল চমৎকার।

হানিফ ঘরনার অনন্য ব্যক্তি হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রেসালাতপ্রাপ্তির দ্বিতীয় দিনেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই হলেন বয়স্ক ও পুরুষদের মধ্যে এবং কুরাইশ বংশের ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি। বাল্যকাল থেকেই বিশ্বনবির সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া সবার মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব লক্ষ করেছি। হয়। দ্বীনি দাওয়াত নিয়ে কোথাও গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সঙ্গে নিয়েই যেতেন।

হিজরতের কঠিন সফরে হযরত আবু বকরই ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সফরসঙ্গী। খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালের পর তিনি তাঁর ছোট কন্যা হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিশ্বনবির সঙ্গে বিবাহ দেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতগুলো অভিযানে অংশগ্রহণ করেছেন, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রত্যেক অভিযানেই তাঁর সঙ্গী। নবম হিজরিতে প্রেরিত প্রথম ইসলামী হজ কাফেলায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আমিরুল-হজ নিয়োগ করেন। এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম শয্যায় শায়িত অবস্থায় বিশ্বনবির নির্দেশে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নামাজে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। সিদ্দিক উপাধি লাভরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তাঁর এত নিখাদ বিশ্বাস ছিল যে, যখন মিরাজের ঘটনাকে কাফেরকুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছিল, যার ফলে কপট শ্রেণীর কিছু মুসলমান মুরতাদ হয়ে গেল এবং অনেক সাধারণ মুসলমানের মন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচালে দুলছিল, তখন হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করলেন, আল্লাহর কসম তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তিনি সত্যই বলছেন, তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না। কাফিরদের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দ্বিধাহীন ও দৃঢ় ঘোষণার কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সিদ্দিক উপাধিতে ভূষিত করেন।ইসলামের জন্য অকাতরে ব্যয়ইসলাম প্রতিষ্ঠায় হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এ অবদান অসামান্য। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি প্রত্যেকটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি। কিন্তু আবু বকরের ইহসান এমন যে আমি পরিশোধে অক্ষম। তাঁর প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। তাঁর অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্য কারো অর্থ তেমন আসেনি। তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাবেই কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট যুবক উসমান, যুবাইর, আবদুর রহমান, সাদ, তালহাসহ আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি যখন ইসলাম কবুল করেন তখন তাঁর সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার দিরহাম। যার সম্পূর্ণটাই তিনি ইসলামের জন্য ব্যয় করেছেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁর শানেই সুরা আল-লাইলের ৫, ৬ ও ৭ আয়াত নাজিল করেছিলেন। `যে ব্যক্তি দান করল ও তাকাওয়া অবলম্বন করল আর যা কিছু উত্তম তা সত্য বলে গ্রহণ করল, তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ (জান্নাত)।বিশ্বনবির ইন্তিকালের ঘোষকরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু একেবারেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। এমন অবস্থায় হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে গেলেন, স্থির চিত্তে তিনি ব্যাখ্যা করলেন সবকিছু। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য শুনে সাহাবায়ে কেরাম সম্বিত ফিরে পেলেন এবং তাদের অবস্থা স্বাভাবিক হয়।

নবীজীর দাফন সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে পরবর্তী দায়িত্বশীল নিয়ে মত-পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। যা হজরত আবু বকর অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ধীরস্থিরভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করে তাদের মত-পার্থক্য নিরসন করেন। তার বক্তব্যে আনসাররা মেনে নিলেন এবং তিনি সর্বসম্মতিক্রমে ইসলামের প্রথম খলিফা নিযুক্ত হলেন। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এক সংক্ষিপ্ত ও নীতিনির্ধারণী বক্তব্য প্রদান করেন, যা চিরকাল বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠের পর বলেন-‘আল্লাহর শপথ! আমি ইচ্ছা আপনাদের মধ্য থেকে কেউ এ গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করুন। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে এ দায়িত্ব দেয়া হলো। যদি আপনারা চান আমার আচরণ রাসুলের আচরণের মতো হোক তাহলে সে ক্ষেত্রে আমাকে অক্ষম মনে করবেন। কারণ তিনি ছিলেন নবী, সব ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত। আর আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি যদি সঠিক কাজ করি তাহলে আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন। আর যদি দেখেন আমি বিপথগামীমুখী, তাহলে আমাকে সতর্ক করে দেবেন।
তিনি অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বনবির ইন্তেকালের পর কিছু সুযোগসন্ধানী লোক রমরমা ব্যবসার মানসে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করে বসে। কিছু বেদুঈন সম্প্রদায় ইসলামী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টা করে। হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে তাদেরকে কঠোর হাতে দমন করে ইসলামী খেলাফতকে সংকটমুক্ত করেন। এ জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলে অভিহিত করেন।

আবু বকর (রা.) একজন একনিষ্ঠ সহচর হিসেবে মুহাম্মদ (সা.) এর সহযোগিতা করেছেন, নবীপ্রেমের সে কী রূপ! তার জীবদ্দশায় আবু বকর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাবুকের যুদ্ধে তিনি তার সমস্ত সম্পদ দান করে দেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে আবু বকর অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন এই চুক্তির অন্যতম সাক্ষী। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “’আমার উম্মতের মাঝে আবু বকরই বেশি দয়ালু।’
নবীজি আরো এরশাদ করেন: “বন্ধুত্ব ও সাহায্য আবু বকরই আমাকে বেশি করেছিলেন। ইহজগতে যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই করতাম।” [বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ]।

খোদা ও নবীপ্রেমে ব্যাকুল ছিলেন তিনি। তাবুক অভিযানে হযরত আব বকর ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পাতাকাবাহী। এই অভিযানের সময় তিনি রাসূলের (সা) আবেদনে সাড়া দিয়ে তার সকল অর্থ রাসূলের (সা) হাতে তুলে দেন। অবাক হয়ে রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু রেখেছো কি?’
জবাবে আবু বকর (রা) বললেন,
‘তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই যথেষ্ট।’

হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন খেদাভীরু, রবের দয়ার আশায় অনুশোচনাকারী। একদা এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীক(রা) কে গালি দিচ্ছিল। সেখানে রাসূল(সা) উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর(রা) কোনো বাদ প্রতিবাদ না করে নীরবে গালি শুনতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি ঐ ব্যক্তিতে তারই দেয়া একটি গালি ফেরত দিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ(সা) এর মুখে অসন্তোষের চিহ্ন ফুটে উঠল। তিনি উঠে বাড়ীতে চলে গেলেন। হযরত আবু বকর ;(রা) ঘাবড়ে গেলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, “হে রাসূল! লোকটি যখন আমাকে গালি দিচ্ছিল আপনি চুপচাপ শুনছিলেন। যেই আমি জবাব দিলাম অমনি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে চলে এলেন।”
রাসূল(সা) বললেন, “শোন আবু বকর, যতক্ষণ তুমি চুপ ছিলে এবং ধৈর্য ধারণ করছিলে, ততক্ষণ তোমার সাথে আল্লাহর একজন ফেরেশতা ছিল, যিনি তোমার পক্ষ হতে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখন তুমি নিজেই জবাব দিতে শুরু করলে তখন ঐ ফেরেশতা চলে গেলেন এবং মাঝখানে এক শয়তান এসে গেল। সে তোমাদের উভয়ের মধ্যে গোলযোগ তীব্রতম করতে চাইছিল।

“হে আবু বকর! মনে রেখ কোনো বান্দার উপর যদি যুলুম ও বাড়াবাড়ি হতে থাকে এবং সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ক্ষমা করতে থাকে এবং কোনো প্রতিশোধ নেয়া হতে বিরত থাকে, তবে আল্লাহ যুলুমকারীর বিরুদ্ধে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করে।”
হযরত আবু বকর(রা) অনুতপ্ত হলেন যে, ধৈর্যহারা হয়ে তিনি আল্লাহর ফেরেশতার সাহায্য হতে বঞ্চিত হয়ে গেলেন।
ফারূকে আযম হযরত উমর (রাঃ) বলেন, “আমি আন্তরিকভাবে এই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি যে, আমার গোটা জীবনের আমল যদি হযরত ছিদ্দীক্বে আকবরের এক রাত্রির আমলের সমান হতো! তা সেই রাত্রি, যেই রাত্রিতে তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হিজরতের সফরে সওর গুহার দিকে রওনা হন।”

তিনি ইসলামের সবচেয়ে বড় যে খেদমতটি করেছেন তা হলো, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্ষিপ্তভাবে থাকা পবিত্র কুরআনের পাণ্ডুলিপিগুলো একত্রে করে একটি পূর্ণাঙ্গ কপি তৈরি করেন, যা মাসহাফে সিদ্দিকী নামে খ্যাত। আর এ মাসহাফে সিদ্দিকীই পরবর্তী সময়ে পবিত্র কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলনে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

হযরত আবু বকরের (রাঃ) অন্তিম অসিয়ত ও উপদেশঃ
হযরত আবু বকর(রা) এর জীবনের অন্তিম ও প্রধান কাজ হলো পরবর্তী খলীফা হিসেবে হযরত উমারকে নিযুক্তি দান।

আহলে রায় অনেকের সাথে তিনি এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন এবং অবশেষে হযরত উসমান (রাঃ) কে ডেকে এ সম্পর্কে ওসিয়ত ও উপদেশ লিপিবদ্ধ করেন। সেই ঐতিহাসিক দলিলটি এইঃ

“পরম দয়ালু ও মেহেরবান আল্লাহর নামে, আল্লাহর দাস ও মুসলমানদের নেতা আবু কুহাফার পুত্র আবু বকর তাঁর ইন্তিকালের মুহূর্তে তাঁর পরবর্তী খলীফা ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এই ওসিয়তনামা লিপিবদ্ধ করছেন এবং স্মরণ করাচ্ছেন যে, মৃত্যুকাল এমনই এক কঠিন সময় যে সময়ের কষ্ট ও ভয়াবহতায় অভিভূত হয়ে কাফেরও মুমিন হতে চায়, চরিত্রহীন ব্যক্তি চরিত্রবান হতে চায় এবং মিথ্যাচারী সত্যের আশ্রয় গ্রহণের জন্যে হয়ে ওঠে ব্যাকুল।

মুসলমানগণ! আমি আমার পরে খাত্তাবের পুত্র উমারকে তোমাদের জন্য খলীফা নিযুক্ত করছি।

তিনি যতদিন কুরআন ও রাসুলের নীতি অনুযায়ী চলবেন ও তোমাদের সেই আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত করবেন, তোমরা দ্বিধা শূন্য চিত্তে তাঁর আনুগত্য করবে।

আল্লাহ ও রাসুল এবং তাঁদের মনঃপুত ইসলাম ও মুসলমান এবং মানবজাতি সম্বন্ধে আমার উপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল, তা আমি উপযুক্ত ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করে কর্তব্য সম্পাদনের চেষ্টা করেছি।

আমার বিশ্বাস, উমার নিরপেক্ষভাবে শাসনদণ্ড পরিচালনা করে ইসলামের গৌরব বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু এর ব্যতিক্রমের দায়িত্ব তাঁর নিজের, কারণ আমি তাঁর বর্তমান ও অতীত জীবনের পরিচয়ের উপর নির্ভর করে তাঁকে আমার স্থলাভিষিক্ত করেছি, কিন্তু ভবিষ্যতের দায়িত্ব আমার নয়। কারণ আমি অন্তর্যামী নই।

তবে এ কথা তাঁকে আমি অবশ্যই স্মরণ করাচ্ছি যে, যদি তিনি নিজের রূপ ও আচরণের পরিবর্তন করেন যা ইসলাম মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর ও গ্লানিকর হতে পারে, তবে তার বিষময় ফল অবশ্যই তাঁকে ভোগ করতে হবে। তোমাদের সকলের কল্যাণ হোক।”

ওসিয়তনামা লেখা শেষ হলে তা সীলমোহর করে হযরত উমারকে ডেকে আবু বকর (রা) তাঁকে এই উপদেশ দিলেনঃ

“খাত্তাবের পুত্র উমার! আমি তোমাকে যাঁদের জন্য খলীফা মনোনীত করছি তাঁদের মধ্যে আল্লাহর প্রিয় নবীর সাহাবাবৃন্দও রয়েছেন। আশা করি এর গুরুত্ব তুমি সম্যক উপলব্ধি করবে।

এই গুরুদায়িত্ব পালনে আমি তোমাকে আল্লাহভীতি সম্বল করতে উপদেশ দিচ্ছি। কারণ যার অন্তর সর্বদা আল্লাহর নিকট জওয়াবদিহির দায়িত্ব স্মরণ করে ভীত হয়, সে ব্যক্তি কখনই অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে না।

মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই ভাগ্যবান যিনি লোভমুক্ত হয়েছেন এবং স্বীয় কর্তব্য নির্ধারণপূর্বক যথা সময়ে তা পালন করতে তৎপর হয়েছেন। সুতরাং তুমি কখনই দিনের করনীয় রাতের জন্য অথবা রাতের করনীয় দিনের জন্য ফেলে রাখবে না এবং কাজের গুরুত্ব ও লঘুত্ব উপলব্ধি করে সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সমাধা করবে।

মনে রেখো, যে ব্যক্তি ফরজ কাজ ফেলে রেখে নফলকে গুরুত্ব দান করে, তার কাজ ততক্ষণ আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত হয় না, যতক্ষণ সে ফরযের গুরুত্ব বুঝে তা সম্পাদন না করে।

সকল মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখা এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাতেই ইসলামের মহিমা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। আরও জেনে রাখো, যে ব্যক্তি সত্য ও ন্যায় বিচারকে প্রাণাপেক্ষাও ভালবেসে ইহলোকে কর্তব্য সম্পাদন করেছে, কিয়ামতের দিন তারই পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে।কিন্তু যারা ইহলোকে মিথ্যার তাঁবেদারি করে অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচারে লিপ্ত হয়েছে, পরলোকে তাদের পুণ্যের পাল্লা শোচনীয়ভাবে হাল্কে হয়ে পড়বে।

হে উমার! আল্লাহ কি কুরআনে এক সঙ্গে অনুগ্রহ ও নিগ্রহ এবং পুরস্কার ও শাস্তির বর্ণনা করেছেন, তার মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করবে। এর মর্ম হচ্ছে এই যে, মুমিনরা আশা ও নিরাশার মধ্য থেকে কর্তব্য নির্ধারণ করতে সমর্থ হবে। সুতরাং তুমি এরূপ কোন অন্যায় লোভ এবং আশায় ক্খনই অভিভূত হবে না, যে আশা তোমাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। আবশ্যকের অতিরিক্ত বস্তুর আকাঙ্ক্ষা কখনই করবেনা। আবার নিজের জন্যে যা অপরিহার্য তা কখনই বিনা কারণে ত্যাগ করবে না।

হে উমার! আল্লাহ সেই সব অসৎ লোকদের জন্য জাহান্নামের ব্যবস্থা করেছেন, জাদের দুষ্কর্ম এতদুর সীমা লঙ্ঘন করেছে যে, আল্লাহ তাদের সৎকর্মসমূহ দূরে নিক্ষেপ করেছেন। অতএব তুমি যখন দোযখ বাসীদের সম্পর্কে আলোচনা করবে, তখন নিজের সম্বন্ধে এটুকুই বলবে যে, ‘আশা করি আল্লাহর অনুগ্রহে আমি তাদের (জাহান্নাম বাসীদের) দলভুক্ত হব না।

‘আল্লাহ সৎকর্মশীলদের জন্যই অনন্ত সুখের জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন। অতএব তুমি যখন পুণ্যাত্মা জান্নাতবাসীদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করবে, তখন নিজের সম্বন্ধে এই ভাব প্রকাশ করবে যে, হে আল্লাহ, তুমি আমার অন্তরে এরূপ সৎকর্মের প্রেরণা দান কর, যার দ্বারা আমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।

হাসান বসরী রা. থেকে ইবন হিশাম বর্ণনা করেনঃ তাঁরা রাতে সাওর পর্বতের গুহায় পৌঁছেন। রাসূলুল্লাহর সা. প্রবেশের আগে আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করলেন। সেখানে কোন হিংস্র প্রাণী বা সাপ-বিচ্ছু আছে কিনা তা দেখে নিলেন। রাসূলুল্লাহকে সা. বিপদমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তিনি এরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন। জীবনে নবীপ্রেমে যেন অতুলনীয় ছিলেন তিনি।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি আবূবকর (রা:)-এর ভালবাসা ও সাহায্য- সহানুভূতি ছিল প্রবাদ তুল্য। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আমি যদি আমার রব ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবূবকরকে গ্রহণ করতাম’।

৮ জুন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২২ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত খেলাফতের দিয়িত্ব পালনের পপর হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ১৫ দিন রোগভোগের পর ১৩ হিজরি ২২ জমাদিউস সানি মোতাবেক ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসের ২৩ তারিখ ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হুজরায়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পাশে পূর্ব দিকে তাঁকে দাফন করা হয়।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে দ্বীনে যথাযথভাবে কায়েম রেখে জীবনের পথপরিক্রমায় “নবীজীর পর শ্রেষ্ট এ মানব” হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর আদর্শ মোতাবেক চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

—–

সংগ্রহ ও সংকলনে:

মোঃ নাজিম উদ্দিন
২২ জমাদিউস সানি-১৪৪০

[বেশিরভাগ তথ্য সংগৃহীত : কোন তথ্যে তারতম্য পরিলক্ষিত হলে সংশোধনে সহায়তা আশা করছি)