ছেলেবেলাঃ সেকাল-একাল বর্ষায় চলাচলঃ বর্ষায় ভ্রমণ

43
4

ছেলেবেলাঃ সেকাল-একাল
বর্ষায় চলাচলঃ বর্ষায় ভ্রমণ

—-

“কাল রাত্তির থেকে মেঘের কামাই নেই। কেবলই চলছে বৃষ্টি। গাছগুলো বোকার মতো জবুস্থবু হয়ে রয়েছে। পাখির ডাক বন্ধ। আজ মনে পড়ছে আমার ছেলেবেলাকার সন্ধেবেলা।”
ঠিক অনেকটা গেঁথে আছে স্কুলজীবনে পড়া রবীন্দ্রনাথের “আমার ছেলেবেলা” প্রবন্ধের শুরুর কথা গুলো।
চারদিকে ঘন ঘোর বরষার রূপ, থেমে আসা বৃষ্টির কারণে অলস বিকেলে বসে আমারও কাটছে সময়। ঠিক তখন মনে পড়লো এ বর্ষায় কেমন কাটতো গ্রামে আমাদের ছেলেবেলা? কেমনই বা কাটে এখন যারা গ্রামে থাকার সুযোগ পায়, সেসব কিশোরের? (‘সুযোগ’ শব্দটা ব্যাবহারের যৌক্তিকতা লেখাটির বিভিন্ন অংশে পাওয়া যাবে)।

প্রথমেই বলে নিই, ঘোর বর্ষার দিননগুলোতে পড়ার তেমস চাপ থাকতো না। স্কুলে যাওয়ার সড়কে পানি উঠা, বেশির ভাগ পরিবারে চাষাবাদের কাজ থাকায় পারিবারিক কৃষিকাজে সহায়তা করা ইত্যাদি কারণে বর্ষাকে কাছে থেকে দেখা বা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি আমরা।

সকালে মাঠে যাওয়ার প্রয়োজন না হলে দাদার সাথে মাছ ধরতে যেতাম। বৃষ্টির পানিতে না ভেজার জন্য মাথায় থাকতো ঝুইর বা প্লাস্টিকের ছাউনির মতো (যা দিয়ে দুহাতে যেকোন কাজ করা যেতো)। অবশ্য
‘ডুলা’ ধরার কাজ ছাতা দিয়েও চালানো যেতো। “মইল্ল্যা জাল” (মলা মাছ ধরার জন্য ছোট ছিদ্রের জাল) দিয়ে মাছ ধরতে গেলে ডুলা ধরার সহযোগীর কাজ থাকতো বেশি। ‘টাক্কুইয়্যা মাছ’ জালে পড়লে তো রক্ষা নেই। ছিড়ে বের করতে হতো মাঝে মাঝে। ডিমওয়ালা মলা মাছের “ঝোল” দিয়ে খাবারের অমৃতরূপ স্বাদের কথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’ রচনায় লিখেছেন দারুনভাবে। জিবে জল যেন না আসে… আহ! কী স্বাদ!

মাছ ধরা শেষে চলতো দুরন্তপনা। রমজান আলী হাটে পাশের দু’চার গ্রাম থেকে নৌকা নিয়ে বাজারে আসলে অস্থায়ী ঘাটে বাঁধা নৌকা ছিলো প্রধান মাধ্যম। বেশিরভাগ নৌকার মাঝিরা বছরের অন্য সময় পুকুরে ‘বড় জাল’ দিতে আসে বিধায় বেশ পরিচিত থাকতো। তারা বাজার শেষ করার আগে অনুমতি নিয়ে কয়েক চক্কর নৌকাভ্রমণ হয়ে যেতো। অবশ্য তারা হুঁশ করে অনুমতি না দিলে আমরা ‘আক্কল’ করে নিয়ে যেতাম চুপিসারে। এবার বন্যার প্লাবিত বিলে নৌকা নিয়ে সে কী দারুন মজা হতো! রফিক চেয়ারম্যানের বাড়ির প্রান্ত পর্যন্ত নৌকাদৌড় ছিলো বেশির ভাগে।

এদিকে নৌকার মাঝি এলে চিৎকার করে ডাকতো কিশোরদের। সে চিৎকারে দুষ্টমতিরা সন্তুষ্ট হলে প্রায়ই ঘাটে নৌকা নিয়ে আসতো। বেশি বকুনি খেলে অবাধ্যরা নৌকা মাঝ পানিতে রেখে সাঁতার কেটে চলে আসতো; এ নিয়ে দুঃখের শেষ ছিলোনা মাঝির। এ যুগের কিশোরেরা এ অভিজ্ঞতার মু্খোমুখি হলে সর্বোচ্চ যা করতে পারে- হাতে মোবাইল নিয়ে সেলফি বা লাইভ- যা ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তা থেকে কৃত্রিম উপভোগ করা ছাড়া বেশি করতে পারবে বলে মনে হয় না।

আবার কলাগাছের উপর চলতো দারুন অত্যাচার। ৪/৫ টা কলা গাছ কেটে ভেলা বানিয়ে আর সাথে গাছের ডাল দিয়ে বৈঠা বানিয়ে দুরন্ত কিশোরেরা করতো বানের পানিতে অবাধ ভ্রমণ। মাঝে মাঝে পুকুরেও ছেড়ে চালাতো এ ভেলা। উপরে পানি, নীচে পানি, ডানে-বামে পানি- এ যেন অকূল, অগভীর সাগরে পানিময়তার চুড়ান্ত রূপ। এ ভেলায় চড়ে মাঝে মাঝে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরতেন বয়োজ্যেষ্ঠগণ। সে এ দারুন অভিজ্ঞতা। পুকুর পাড় থেকে আমাদের ডাকটা ছিল বেশ -বায়্যি না ন বায়্যিই?” আহা! কত স্মৃতি!

একেবারে কিছু করতে না পারলে অর্ধ বা পূর্ণ নিমজ্জিত রাস্তার উপর দলবেঁধে হাঁটা আর রমজান আলী হাটের খানিক পূর্বে (প্রকাশ অঁতলা -যা পরবর্তীতে কালভার্ট থেকে ছোট ব্রীজে রূপ নেয়, আমার জানামতে নামকরণ হয়ে ডাঃ দুদু মিয়ার নামে)- জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে চলে যেতাম- উচ্চ চিৎকারে, শত উচ্ছ্বাসে।

আজকের কিশোর যুবার গ্রামে বড়।হওয়াদের কিছু অভিজ্ঞতা থাকতে পারে, তবে মনে হয়, আমাদের সময়ের অফুরন্ত অবসর সময়ের কৈশোর তাদের আর নেই। পাবাজি বা মোবাইলে গেইমস, ফেইসবুক বা টুইটার তাদের সময় কেড়ে নিচ্ছে অহরহ। তাদের একটা গ্রুপ ইউটিউব বা ফেইসবুকে বর্ষার দৃশ্য দেখে ‘wow’ রিয়েক্ট দেয়, কিন্তু সময় সুযোগ করে ‘ঘর হতে দু পা ফেলিয়া’ নিজের চোখে দেখার অপার আনন্দ কি তারা পায়? আজ তারা রবীন্দ্রননাথের “ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাইরে” লাইনটাই আত্মস্থ করেছে হয়তো। দুরন্তপনার ফলে স্বাস্থ্য যে দারুন রকমের ভালো ছিলো, সে স্বীকারোক্তি পড়েনি হয়তো। যেমনটি কবিগুরু বলেন,
“শরীর এত বিশ্রী রকমের ভালো ছিল যে, ইস্কুল পালাবার ঝোঁক যখন হয়রান করে দিত তখনও শরীরে কোনোরকম জুলুমের জোরেও ব্যামো ঘটাতে পারতুম না।”

তখনকার সময়ে হয়তো বিনোদনের খুব অভাব ছিলো বলেই যে কয়টি ঋতিভিত্তিক বিনোদন, খেলাধুলা চলতো, তা-ই তলানিসহ উপভোগ করতাম আমরা।

“শহরে আজকাল আমোদ চলে নদীর স্রোতের মতো। মাঝে মাঝে তার ফাঁক নেই। রোজই যেখানে-সেখানে যখন-তখন সিনেমা, যে খুশি ঢুকে পড়ছে সামান্য খরচে।” আক্ষেপটা আধুনিক রবীন্দ্রনাথের।

সেকাল একালের যোজন দূরত্বে দাড়িয়ে সোনালি অতীত রোমান্থনের ‘সুযোগ’ আমাকে একদিকে অবর্ণনীয় স্মৃতিসুধায় মুগ্ধ করে, অন্যদিকে সমসাময়িক নিষ্ফলা মাঠে অচেষ্টুক কৈশোরের নিস্তব্ধতা ব্যথিত করে।

ফিরে আসুক নান্দনিক অরণ্য, কৈশোর হোক দুরন্তপনায় ধন্য, এ কামনা।


মোঃ নাজিম উদ্দিন
আগষ্ট ০৭, ২০২১

43 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here