চট্টগ্রামের পটিয়ার বাহুলিঃ সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি..

0
49

প্রিয় বন্ধুবর ইফতেখারের বাড়ি পটিয়ায় যাওয়ার দাওয়াত পেয়েছি অনেক দিন আগেই। সময় হয়ে উঠেনা কোনভাবে। যাই হোক ‘ট্যুর’ করে ট্যুর (ভ্রমণ) পিয়াসি ইফতেখারের সাথে গত ক’দিন এ নিয়ে ফোনে কথা হচ্ছিল যার খসড়া চুড়ান্ত হয় গতরাতে: আমরা ভোরে পটিয়া যাবো, দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসবো।

কথামত সকাল ৭টায় যাত্রা শুরু। যাত্রী আমরা মাত্র দু’জনই! অপার সৌন্দর্যমন্ডিত কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মীত বিশাল ব্রিজের উপর দাড়িয়ে ছবি তোলার সেশনটাও মিস করিনি। হালকা বৃষ্টির মাঝে ৮টার পর পটিয়া পৌছলাম। পটিয়ার মদিনা হোটেলের বিখ্যাত নান-রুটির স্বাদ না নিলে কি হয়! দারুন ব্রেকফাস্ট!


ব্যস্ত পটিয়া বাসস্টপ থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্ব বাহুলি গ্রামের দিকে পৌছাতেই নজর কাড়লো সরু সড়ক, একটা রেললাইন, উন্নয়নের ছোঁয়ায় সুশোভিত পুকুরঘাট ইত্যাদি। “সাজেদা” ভবনে পৌঁছে ইফতেখারের পিতা, পাকিস্তান আমলের গ্র্যাজুয়েট, সাবেক এইচআরসি কর্মকর্তা জনাব কাজি তৈয়ব চাচা এবং ইফতেখারের মাতা (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা) -দুু’জন মানুষের সান্নিধ্য ও আন্তরিক আতিথেয়তা মনে রাখার মতো। সে ব্যাপারে বর্ণনা পরের অংশে আবার আনা হয়েছে।

দ্বিতল সুরম্য সাজেদা ভবন এবং ইটের প্রাচিরবেষ্টিত জায়গাটা ততটা বড় না হলেও খ্যাতিমান স্তপতির নকশায় তৈরি তা বুঝাই যাচ্ছে- ভেতরে বেশ কিছু ফল-ফুলের ছোট বাগান পরিবারের সদস্যদের সুন্দর রুচির পরিচায়কও। এবার গ্রামের চারপাশ দেখার পালা। গুণী ব্যক্তি, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে ভরপুর চিকন কাজি পাড়ার সে বাড়িটিই শ্রদ্ধেয় লেখক-সংগঠক বাদল সৈয়দ স্যারের নানার বাড়ি জেনে আরো বেশি ভাল লাগলো। শুরু হলো হাঁটা, ঘুরা, পরিদর্শন।

এরই মধ্যে বেড়ানোর লোভ সইতে না পাড়া ভাগিনা হুমায়নের যোগদান। যোগ হলো নতুন সংযোগ। পাশেই সহকর্মী ইদ্রিসের ঘর। তার সাথে সাক্ষাত। আমাদের দেখে তার খুশি চোখমুখে ফুটে উঠলো। তার পরিবারের তৎক্ষণাৎ আপ্যায়ন, খাতিরে আমরা যারপরনাই মুগ্ধ।

এরপর শুরু হলো উত্তরের দিকে যাত্রা। শুক্রবার তাই জুমার পূর্বেই ফিরতে হবে। সেটা জেনে খুব সময় সচেতন হয়েই আমাদের যাত্রা। যত উত্তরে যাই, ততই  কমতে থাকে লোকালয়, বাড়তে থাকে প্রকৃতি, ধান ক্ষেত, পেপে,লাউ, কচু ইত্যাদির মনোরম দৃশ্য।

আমাদের মমতো, গ্রামে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে সারা বাংলার প্রকৃতিই যেনো এক সহজাত রূপেই ধরা দেয়। পটিয়ার বাহুলি গ্রামের দৃশ্যে তাই খুঁজে পাচ্ছিলাম নিজের প্রিয় গ্রাম রাউজানের মোহাম্মদপুরকে। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।

যাই হোক, স্বভাবতই গ্রামের এ দৃশ্য অনেকদিন পর স্বচক্ষে দেখে স্মৃতির এলবাম সমৃদ্ধ করার লোভ ক’জনে সামলাতে পারে? আমিও পারিনি। মোবাইলে চার্জ ছাড়া আর কোন আর্থিক ক্ষতিও নেই! শুরু হলো মুহুর্মুহু ছবি তোলার মহড়া!

নান্দনিকতায় পূর্ণ লাউক্ষেতে ঝুলে থাকা শতশত লাউয়ের মায়াবী দৃশ্য, ফলসহ পেঁপেক্ষেত বা কচু ক্ষেতের কোনটাই বাদ যায়নি আমাদের ক্যামেরা থেকে।

কখনো বাছুর, ছাগল, কখনো দু’পাশে গাছের সারি, কখনো সবুজ ধানক্ষেত, কখনো বয়ে যাওয়া ছোট খাল- যার অগভীরতায় রবী ঠাকুরের ভাষায়-পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি”- যে দৃশ্য দেখার সময় আমাদের থাকেনা, যে সবুজে সতেজ হয়না, বরং হতে পারেনা আমাদের দু’নয়ন, তার ব্যর্থতা যেন স্মরণ করিয়ে দেয় WH Davies এর বিখ্যাত Leisure কবিতার সে বিখ্যাত লাইনগুলোঃ

“What is this life if, full of care,
We have no time to stand and stare.
No time to stand beneath the boughs
And stare as long as sheep or cows.
No time to see, when woods we pass,
Where squirrels hide their nuts in grass.
No time to see, in broad daylight,
Streams full of stars, like skies at night.”

এরই মধ্যে দেখা গেলা কিছু চঞ্চল দুষ্টু কিশোরের ব্যস্ত সময়ও, না তারা আধুনিক কিছু বাচ্চার মতো, শহুরে কিশোরদের মতো কার্টুন, মোবাইলে ইন্টারনেট দিয়ে ইউটিউবে অন্যের বানানো গেইমস দেখায় ব্যতিব্যস্ত নয়, ব্যস্ত নয় টেলিভিশনে অনুষ্টান দেখাতে, গ্রামের এ ছেলেগুলো ব্যস্ত নিজেদের খেলায়, কেউ রঙিন মার্বেল দিয়ে খেলে, কেউ কাদামাটির মাঠে ফুটবল খেলায় খুব ঘোরদৌড় দিচ্ছে, কিবা প্রতিপক্ষকে হারানোর দৌড়ে, কেউ চাকার বেয়ারিং- দিয়ে তৈরি টানার গাড়িতে একে অপরকে টেনে নেয়ার খেলায়, কেউ বা ছড়া/খালের বালুচরে ফুটবল খেলার ব্যস্ততায়- সে এক নস্টালজিক দৃশ্য- মুহুর্তেই নিয়ে গেলো প্রায় ২৫/২৬ বছর পূর্বে আমার গ্রাম্য বাল্যবেলায়!

দারুন নস্টালজিয়ায় আমি সেসব কিশোরের মাঝে নিজের কৈশোর আবিষ্কার করছি মুহুর্মুহু আর ছবি তুলে দুধের স্বাদ যেনো ঘোলে মিটাচ্ছি! আহা শৈশব!

এবার সোজা কর্দমাক্ত ধানক্ষেত!  বাতাসে দোল খাওয়া ধানের শিষের দৃশ্য যেনো ৫৬ হাজার বাংলা মাইলের এক মানচিত্র!

এ আমার বাংলাদেশ! কত কিছুই।”দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দু ডি ফেলিয়া”!.. আহা, উপরের কালো মেঘের আনাগোনা, নিচে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, এ সবুজের মুর্ছনা হৃদ্য করে, তুষ্ট করে, মুগ্ধ করে আমাদের হিয়া- আমাদের মনে করিয়ে দেয় সোনার তরীর সে লাইন-

“ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।”

সাঙ্গ হলও এবার। এবার ফেরার পালা। গরমে কিছুটা ঘর্মাক্তও। পুকুরে গোসল করার সব অনুষঙ্গ প্রস্তুত। নেমে গেলাম দেরি না করেই। অতপর প্রশান্ত চিত্তে জুমার নামাজ শেষে আন্টির হাতে তৈরি স্বাদের খাবার আর শহর থেকে ইফতেখার ভাবির পাঠানো মজার সব আইটেম যেন গোগ্রাসে খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছি। কয়েক মিনিটের কাক-ঘুম শেষে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম।

অবশেষে কৃতজ্ঞচিত্তে আমাদের বিদায়ে অবসরপ্রাপ্ত চাচা-চাচীর মন খারাপের বেদনা লুকিয়ে রাখার অভিনয় করলেও আমাদের চোখে ধরা পড়েছে সুক্ষভাবে। তবুও যেতে হবে..তবু চলে যাই। এ যেন চিরন্তন বাস্তবতার খন্ডচিত্র।

এরপর ড্রাইভিংটা ছিল ফুরফুরে।মেজাজের। কখনো নচিকেতা, কখনো লালন যেনো চেপে বসেছে।আমাদের উপর! চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে গাড়ির চাপ বিকেলে কিছুটা কম থাকায় অপেক্ষাকৃত কম সময়েই, জীবনের চিরন্তন সত্যের মতো পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের মতোই বেলা পার হয়ে যাচ্ছিলো, আমরাও পৌছে গেলাম নিজ নিজ গন্তব্যে। নিরাপদে। আলহামদুলিল্লাহ।

আর এ সবকিছুর জন্য হোস্ট বা সাহেব-এ-দাওয়াত কাজী ইফতেখার রুবেল, ভাবি, চাচা-চাচীর প্রতি কৃতজ্ঞতা। এমন প্রাণচঞ্চল, উপভোগ্য, ব্যতিক্রমী কিন্তু সমৃদ্ধ দিন ফিরে আসুক বারবার।

(ছবিগুলো কিছু ইফতেখারের তোলা, কিছু হুমায়নের আর কিছু
আমার তোলা)

# মোঃ নাজিম উদ্দিন
২১-০৮-২০২০