কোরআনে ফিরে যাওয়া নিয়ে যতকথা ও পেছন ফেরার তাগিদ

0
1

কোরআন থেকে নেয়া -০৩

কোরআনে ফিরে যাওয়া নিয়ে যতকথা ও পেছন ফেরার তাগিদ
————–

পেছন ফেরার বিচিত্র তাগিদ মানুষের সহজাত। ছোট বেলায় সবাই চান বড় হতে আর ধীরে ধীরে পূর্ণবয়স্ক হলে সেই ব্যক্তিই ফিরে পেতে চান শৈশব। কনের কাছে যেমন বাপের বাড়িতে যাওয়ার আকুলতা থাকে, তেমনি থাকে পাখিদের নীড়ে ফেরার দৌড়!

খুব সুন্দর এক উপমাও দিয়েছেন এক কবি …নুরালি বাঁশীকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সুর এত করুণ কেন? বাঁশী উত্তর দিল, এই সুর ঘরে ফিরে যাওয়ার কান্নার অনুষঙ্গ! সে কী সুর, করুণ, বেদনাতুর….
ফিরে তো যাবেই। কারণ এ জীবন সংক্ষিপ্ত। মুহুর্তের পরীক্ষাক্ষেত্র।
মহাকালের তুলনায় শুধু ‘মিলি’ সেকেন্ডেরও কম সময়ের জীবনের সং‌ক্ষিপ্ততা ভাবিয়ে তোলারই কথা।

“রাজেউন” শব্দ ডজনেরও অধিকবার পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আদি অনাদি সব কিছুর একচ্ছত্র মালিক যে আসল বাড়ির কথা বলেছেন, তার পানে ছুটে যাওয়ার মাঝে এই দুনিয়ার জীবন কত স্বল্প তা বুঝার জন্য জন্মের পর আজান আর সে আজানের নামাজ ইন্তেকালের পর জানাজার নামাজ সম্পাদনই যথেষ্ট।

মৃত্যুর পর যে মৃত্যুহীন জীবনের শুরু, সে জীবনের আস্বাদন চায় স্রষ্টার প্রতি প্রেমে প্রেমময় সে সৃষ্টি। লওহে মাহফুজের আসল সৃষ্টি-স্থলের “স্থান-কাল”বিহীন সেই চিরস্থায়ী আবাসভূমে ফিরে যেতে চায় সে প্রেমে বিলীন আত্মা…
পেছন ফেরার এ তাগিদ বড়ই বিচিত্র!

আল্লাহ বলেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন; একজন মুমিনের যে কোনো ধরনের বিপদ-আপদ সামনে এলেই বলবে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। মু’মিন ব্যক্তির এ কথা বলার অর্থ কেবল মুখে বলা নয়; বরং মনে মনে একথা স্বীকার করে নেওয়া যে, ‘আমরা আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন’। তাঁর কাছেই ফিরে যাবো।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা (এসব) বিপদে পতিত হয়, তখন বলে- [ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন] নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সেসব লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৭)।

অন্যত্র এরশাদ হয়েছে,
আল্লাহই তোমাদের জীবন দান করেছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। আবার তিনিই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। তারপরও মানুষ অতি-অকৃতজ্ঞ!’
(সূরা হজ, আয়াত ৬৬)

ফিরে যেতে হবে, পুনরায় তাঁর (রবের) কাছে ফিরে যেতে হবে- এ কথা পুনঃপুন বলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য, দায়িত্ব, গন্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে সদা জাগ্রত করে চলেছেন।

তিনি আরো বলেন,
“সত্যের পথে তোমরা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করো বা নিহত হও, তোমরা আল্লাহর কাছেই সমবেত হবে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৮)

মৃত্যুপরবর্তী অমোঘ জীবনের কথা, পাথিব জীবনের সংক্ষিপ্ততার কথা বারংবার বলেছেন পবিত্র কোরআনে।
“প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ করতে হবে। বিচারের দিনে তোমাদের সবাইকে কর্মফল পুরোপুরিই দেয়া হবে। সফল মানুষ হবে সে-ই, যাকে লেলিহান আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে। আর শুধু পার্থিব জীবন তো এক মরীচিকাপূর্ণ ভোগ-বিভ্রম ছাড়া কিছুই নয়।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)

এ বর্ণনার সময় মাঝে মধ্যে তিনি প্রশ্ন করেছেন, প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছেন বহুবারঃ

‘হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে?’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৪)

মৃত্যুর পর ফিরে আসতে হবে- এ যেন শাশ্বত বিধান। তিনি বলেন,
‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভালো ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে।’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৫)
সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক রাব্বুল আলামিন দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বলেন,
‘হে মানুষ! আমিই জীবন দান করি। আমিই মৃত্যু ঘটাই। আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে। যেদিন জমিন বিদীর্ণ হবে এবং মৃত্যুরা উত্থিত হয়ে ছুটতে থাকবে, তখন তাদের সমবেত করা খুব সহজ একটি কাজ।’ (সূরা কাফ, আয়াত ৪৩-৪৪)
সরা জুমআর নিচের কথাগুলো কতইনা ষ্পষ্টঃ

‘হে নবী ওদের বলুন, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাতে চাচ্ছ, তোমাদেরকে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে। শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে হাজির করা হবে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে। জীবদ্দশায় যা করেছ, তা তোমরা তখন পুরোপুরি জানতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।’ (সূরা জুমআ, আয়াত ৮)

পরকাল নিয়ে সংশয়, ভাবনা, চিন্তা, আশংকা, মজান রব তাদের বহুবার মনে করিয়ে দেন,

‘যারা মুক্তমন নিয়ে শোনে, তারাই সত্যের ডাকে সাড়া দেয়। মহাবিচার দিবসে আল্লাহ মৃতদের পুনর্জীবিত করবেন। তারপর তারা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সূরা আনজাম, আয়াত ৩৬)

হাশরের দিনের পুনরুত্থানের ব্যাপারে তিনি সতর্ক করেন বহুবারঃ

‘তিনিই নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটান আবার প্রাণকে করেন নিষ্প্রাণ। ধূসর জমিনকে তিনিই সজীব করে তোলেন। এমনিভাবে তোমাদেরও মৃত অবস্থা থেকে পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সূরা রুম, আয়াত ১৯)

মূলতঃ আমরা কোন সংক্ষিপ্ত যাত্রায় গেলে আয়োজকেরা বারংবার তাগাদা দেন দ্রুততার সাথে ফিরে আসার জন্য। কোন দ্বীপে যাত্রার সময় যাত্রালগ্নেই যেমন বলা হয়, বেলা থাকতেই আমরা ফিরে যাবো, ফিরে যাবো, ফিরে যাবো, ফিরে যেতে হবে- তেমনি মহান রব্বুল আলামিন তাগাদা দিয়েছেন জীবনের সংক্ষিপ্ততার ব্যাপারে, তাগাদা দিয়ে জানিয়েছেন পরকালে তাঁর কাছে ফিরে যাবার অনস্বীকার্যতাও।

আল্লাহ আমাদের যথাযথ আমল নিয়ে রবের সামনে দাড়িয়ে রবের দয়া প্রার্থণা করার তৌফিক দান করুন। আমিন

——
মোঃ নাজিম উদ্দিন
আগষ্ট ৭, ২০২২