ওফাতবার্ষিকীতে স্মরণঃ ন্যায়বিচারের প্রতীক হযরত উমর (রা.)

0
2

ওফাতবার্ষিকীতে স্মরণঃ ন্যায়বিচারের প্রতীক হযরত উমর (রা.)

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) এর জন্ম ৫৮৩ খিস্টাব্দে তিনি কুরাইশ বংশের বিখ্যাত আদ্দি গোত্রে। ‘ফারুক’ তাঁর গুণবাচক নাম। উমর (রা.) এর পিতা খাত্তাব কুরাইশ বংশের একজন বিখ্যাত লোক ছিলেন।

হযরত উমর (রা.) শিক্ষা-দীক্ষায় বেশ অগ্রসর ছিলেন। কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানে হযরত উমর (রা.) এর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল।

ইসলাম গ্রহণঃ
মহানবী (সা.) যখন ইসলামের কথা বললেন তখন কাফের কুরাইশরা ক্ষিপ্ত হলো। তিনি মূর্তিপূজা ত্যাগ করতে বলায় মুশরিকরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তার নবীজী (সা.) এর উপরে জুলুম চালাল। এক সময় তারা নবীজীকে হত্যা করার ঘোষণা দিল। এ জন্য তারা পুরস্কারও ঘোষণা করল। কিন্তু, মহানবী (সা.) কে মারার দুঃসাহস কেউ দেখায়নি।
অথচ, উমর (রা.) তাতে রাজি হন। তিনি তরবারি কোষমুক্ত করে নবীজীকে হত্যার জন্য ছুটলেন। পথিমধ্যে এক ঘটনা ঘটল। নঈম নামে এক লোকের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। সে জিজ্ঞেস করল,

কোথায় যাচ্ছো উমর?
তিনি রাগতস্বরে জবাব দিলেন,
মুহাম্মদ (সা) কে হত্যা করতে যাচ্ছি।
সে বললো,
তোমার বোন ও ভগ্নিপতি মুসলিম হয়ে গেছে তার কিছুই করতে পারছ না, অথচ তুমি মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করবে?

এ কথা শুনে উমর (রা.) অপমানে আরও রেগে গেলেন। তারপর তিনি গতি পরিবর্তন করে ছুটে গেলেন বোনের বাড়িতে। বোনের ঘরে ঢুকে তিনি ভগ্নিপতিকে মারধর শুরু করলেন। বোন এগিয়ে এলে তাকেও মারলেন। তাঁর মারের চোটে বোন ও ভগ্নিপতি আহত হলে তাদের শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে উমরের হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক হল।

উমর (রা.) তখন জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কী পড়ছিলে? উমরের বোন জবাব দিলেন, কুরআন পড়ছিলাম। হযরত উমর (রা.) বললেন, তা আমাকে দেখাও। বোন বললেন, তুমি অপবিত্র। অপবিত্র হাতে কুরআন স্পর্শ করা যাবে না। বোনের এ কথা শুনে উমর (রা.) পবিত্র হয়ে এলেন। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বাহা ও হাদিদের আয়াতগুলো পড়লেন।

মহান আল্লাহর বাণী তাঁর মনের ভিতর তোলপাড় সৃষ্টি করল। তিনি কেমন যেন হয়ে গেলেন। উমর (রা।) বললেন, নবীজী কোথায়? আমি তাঁর কাছে যাব, মুসলমান হবো। এরপর তিনি প্রিয় নবীর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
ইসলাম গ্রহনের পর উমর (রা.) কাবার সামনে প্রকাশ্যে নামায আদায়ের ঘোষণা দিলেন।

ইসলামের সেবাঃ
যে উমর (রা।) ছিলেন ইসলাম ও মুসলমানদের চরম বিরোধী, তিনি মুসলমান হয়ে সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। ইসলামের সেবায় তিনি তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করে দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর প্রকাশ্যে দ্বীনের প্রচার করা সম্ভব হলো।

খলিফা নির্বাচনঃ
হযরত আবু বকর (রা.) এর ইন্তেকালের পর ২৪ খিষ্টাব্দে বা ১৩ হিজরী সালের ২৩ জমাদিউল উখরা উমর (রা.) খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২৩ হিজরির ২৩ জিলহজ অর্থাৎ ৬৪৪ সালের ৩রা নভেম্বর তাঁর খেলাফতকাল সমাপ্ত হয়। তিনি ১০ বছর ৬ মাস খেলাফতের দায়িত্বভার পালন করেন। তাঁর খেলাফতকালে মুসলিম সাম্রাজ্য অনেক দূর বিস্তৃতি লাভ করে। তাঁর আমলে রোম, পারস্য, সিরিয়া, মিসর ও ফিলিস্তিন বিজিত হয়।

উমর (রা) এর সুশাসনঃ
হযরত উমর (রা.) ছিলেন এক অনন্য শাসক। রাসূল (সা.) এর পর দুনিয়ার ইতিহাসে তাঁর সুশাসনের তুলনা হয় না। ঐতিহাসিক ইমামুদ্দিন বলেন, উমর (রা) শুধু বিজেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং সফলকামী জাতীয় নেতাদের অন্যতম। তিনি সুশাসন প্রতিষার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করেন। তাঁর আমলে প্রথম জেলখানা স্থাপিত হয়।

তিনি কর্মচারীদের বেতননীতি প্রবর্তন করেন।
তিনি প্রথম গোয়েন্দা বিভাগ চালু করেন।
আদমশুমারি তাঁর আমলে চালু হয়।
তিনি চাকুরিতে পেনশন, প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা, চেকব্যবস্থা, ভূমি জরিপ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
তাঁর আমলে বিচারের ক্ষেত্রে কোন শৈথল্য ছিল না। এ ব্যাপারে তিনি নিজ পুত্র ফাহামকেও ক্ষমা করেননি। তিনি তাকে কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। তিনি গরীব দুঃখী প্রজাদের অবস্থা দেখার জন্য রাতে একাকী মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াতেন।

অনাড়ম্বর জীবনযাপন
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হয়েও তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। যে খলিফার ভয়ে পৃথিবীর রাজা-বাদশাগণ সবসময় কম্পমান থাকতেন, সেই খলিফা অত্যন্ত দীনহীন ও সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। তিনি সাথে নিতেন না কোন দেহরক্ষী। রাজকোষাগার থেকে তাকে যে ভাতা দেওয়া হত, তাও ছিল একেবারে নগণ্য।

খাওয়া-দাওয়া করতেন একেবারে সামান্য, যা না খেলে বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল মানুষের পক্ষে।
তার পোষাক ছিল না রাজাধিপতির উপযুক্ত। তালিযুক্ত পোষাক পরিধান করতেন।

জেরুজালেমের খ্রিষ্টান মেয়রের আহবানে তিনি একবার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর ভৃত্য পালাবদল করে উটে আরোহণ করে জেরুজালেম পৌঁছান। উট যখন জেরুজালেম পৌঁছাল, তখন উটের পিঠে ছিল ভৃত্য আর খলিফা রশি ধরে হেঁটে আসছিলেন। তাঁর পরনে ছিল ছিন্নবস্ত্র, যা ছিল ধুলোয় মলিন। খলিফার এই পোশাক ও অবস্থা দেখে খ্রিষ্টান মেয়র ও অন্যান্য সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
কবি নজরুলের ভাষায়,

!ভৃত্য চড়িল উটের পিঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কিনা,
কী গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি বিশ্ববাণী!”

তিনি এমন সরল-সহজ জীবনযাপন করতেন যে, প্রজাদের জন্য তিনি নিজ কাঁধে বহন করে খাবার পৌঁছে দিতেন।

হযরত উমর (রা.) এর চরিত্র মাধুর্য
খলিফা উমর (রা.) শুধু অনাড়ম্বর জীবনযাপনই করতেন না। তিনি ছিলেন পরম দয়ালু ও ন্যায়নিষ্ট। সকল স্মরণীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর চরিত্রে। ধর্মানুরাগ, কোমলতা, সংযম ও বিচক্ষণতায় তিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.) এর প্রতিচ্ছবি।

তিনি মুসলমানদের একজন যোগ্য নেতা ছিলেন। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় অর্ধসভ্য আরব জাতি অধঃপতনের হাত থেকে উদ্ধার ভাল করেছিল। তাঁর ন্যায়নিষ্ঠা ও নিরপক্ষ বিচারব্যবস্থা সমাজকে সুন্দর ও স্থিতিশীল করেছিল। তাঁর নিষ্কলুষ চরিত্র মাধুর্য তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

শাহাদাতবরণ ও দাফনঃ
একদিন মসজিদে নববিতে এশার নামাযে ইমামতি করার সময় আবু লুলু নামক এক কাফের তাঁর মাথা ও নাভিতে বিষাক্ত তরবারি দিয়ে আঘাত করে। আহত অবস্থায় তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ২৩ হিজরী সালের ২৭ জিলহজ শনিবার তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
হযরত সোহাইব (রা.) তাঁর নামাযে জানাজায় ইমামতি করেন। তাঁকে নবীজীর কাছাকাছি হযরত আবু বকর (রা.) এর বাম পাশে দাফন করা হয়।

ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। হযরত উমার (রা.) তাঁর মহান চরিত্রগুণ, মানবসেবা, ইসলামের খেদমত এবং মুসলিম জাতি গঠনে অসাধারণ অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।

তাঁর উত্তম জীবনাদর্শ আমাদের জন্য অনুকরণীয়। এ বিশ্বে যতদিন ন্যায়বিচারের কথা আসবে, যতদিন ন্যায়নীতিবান খোদাভীরু শাসকের কথা আসবে, যতদিন মানুষ হয়ে অপর মানুষকে যথাযথ সম্মানের কথা আসবে, যতদিন শাসকের স্বচ্ছতা, জবাবদাহীতার কথা আসবে, ততদিন চির উজ্জ্বল হয়ে জাগরুক থাকবে হযরত উমরের নাম।


সংকলনে
মোঃ নাজিম উদ্দিন
২২ জিলহজ্জ্ব, ১৪৪৩ হিজরী
জুলাই ২২, ২০২২