আন্তর্জাতিক কন্যাসন্তান দিবসঃ প্রসঙ্গকথা

343
89

আন্তর্জাতিক কন্যাসন্তান দিবসঃ প্রসঙ্গকথা

———————-

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ আন্তর্জাতিক কন্যা সন্তান দিবস। মূলত প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার এ দিবসটি সারা বিশ্বে উদযাপিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। আজকের কন্যা, আগামীদিনের মাতা, অতপর দাদী। পৃথিবীর সবচেয়ে মমতাময়ী তিনটা নাম। কন্যাবিহীন একটি ঘর যেন পুষ্পবিহীন উদ্যান। মূলতঃ কন্যা সন্তান আল্লাহ প্রদত্ত সুন্দর ও বরকতময় উপহারগুলোর একটি।

অন্যদিকে কন্যা সন্তান হলে তা অপছন্দ করা, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা এবং তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করা, প্রাক্ইসলামী যুগের বর্বরতা বা জাহেলি যুগের কুপ্রথার নামান্তর এবং আল্লাহ তায়ালার অপছন্দের জিনিগুলোর একটি।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে।

তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে নাকি তাকে মাটির নিচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখো, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট। ’ (সুরা আন-নাহল, আয়াতঃ ৫৮-৫৯)

প্রিয় রাস‍ুল (সা.) মেয়েদের অনেক বেশি ভালোবাসতেন। মেয়েরা ছিলেন তাঁর আদরের দুলালী। আজীবন তিনি কন্যাদের ভালোবেসেছেন এবং কন্যা সন্তান প্রতিপালনে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। কন্যা সন্তান লালন-পালনে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন।

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দু’টি কন্যাকে তারা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এ দু’টি আঙ্গুলের মতো পাশাপাশি আসবো (অতঃপর তিনি তার আঙ্গুলগুলি মিলিত করে দেখালেন)’।
(মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৩১, তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯১৪, মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং: ১২০৮৯, ইবনু আবি শাইবা, হাদিস নং: ২৫৯৪৮)

আবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলনে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করনে, ‘যার ঘরে কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলো, অতঃপর সে ওই কন্যাকে কষ্ট দেয়নি, মেয়ের উপর অসন্তুষ্টও হয়নি এবং পুত্র সন্তানকে তার ওপর প্রধান্য দেয়নি, তাহলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবশে করাবেন। ’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং: ১/২২৩)

হযরত আবদুল্লাহ উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ওই নারী বরকতময়ী ও সৌভাগ্যবান, যার প্রথম সন্তান মেয়ে হয়। কেননা, (সন্তানদানের নেয়ামত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে) আল্লাহ তায়ালা মেয়েকে আগে উল্লেখ করে বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। ’
(কানযুল উম্মাল ১৬:৬১১)

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার কাছে এক নারী এলো। তার সঙ্গে তার দুই মেয়ে। আমার কাছে সে কিছু প্রার্থনা করলো। সে আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না। আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করললো এবং তা দুই টুকরো করে তার দুই মেয়ের মাঝে ভাগ করে দিলো। তা থেকে সে নিজে কিছুই খেলোল না। তারপর নারীটি ও তার মেয়ে দু’টি উঠে পড়লো এবং চলে গেলো। ইত্যবসরে আমার কাছে নবী (সা.) এলেন। আমি তার কাছে ওই নারীর কথা বললাম। নবী (সা.) বললেন, ‘যাকে কন্যা দিয়ে কোনো কিছুর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় আর সে তাদের প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তবে তা তার জন্য আগুন থেকে রক্ষাকারী হবে। ’
(মুসলিম, হাদিস নং : ৬৮৬২; মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং : ২৪৬১৬)

সমাজে অনেককে দেখা যায়, কন্যাসন্তান প্রতিপালনে বৈষম্য রাখে এবং বস্তুবাদী ব্যক্তিরা যেন এ নিয়ে হীনমন্যতায় না ভোগেন। তাদের এ ব্যাপারে অর্থাৎ কন্যা প্রতিপালনে ধৈর্য ধরার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে জানানো হয়েছে পরকালে বিশাল প্রাপ্তির সংবাদ।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের কষ্ট-যাতনায় ধৈর্য ধরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুহাম্মদ ইবন ইউনূসের বর্ণনায় এ হাদীসে অতিরিক্ত অংশ হিসেবে এসেছে): এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রাসুল, যদি দু’জন হয়? উত্তরে তিনি বললেন, দু’জন হলেও। লোকটি আবার প্রশ্ন করলো, যদি একজন হয় হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, একজন হলেও।’
(বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১১)।

ইসলাম কন্যাসন্তানকে সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। যুগে যুগে মনিষিগণও কন্যাকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছেন।
Laurel Atherton বলেন, ”A daughter is one of the most beautiful gifts this world has to give.”

Denise Van Outen বলেন,
“My daughter is my biggest achievement. She is a little star and my life has changed so much for the better since she came along.”

বাংলায় খুব সুন্দর কবিতা লিখেছেন কবি সুদীপ তন্তুবায় (নীল) তার “কন্যা তুমি” কবিতার শুরুতে লিখেছেন-

“কন্যা তুমি মেঘের দেশের পরী,
যখন আমি ভাবি তোমায়
রাত্রি দুপুর ধরি ।

কন্যা তুমি বৃষ্টি ভেজা রাত,
যখন আমি স্বপ্নে ধরি
তোমার দুটি হাত।”

কন্যাসন্তান প্রতিটি পরিবারে ফিরে আনে প্রাণচাঞ্চল্য আর পিতা মাতার জন্য প্রশান্তির প্রাণকেন্দ্র। কন্যার রয়েছে সমান সম্ভাবনা, প্রতিভাও। কন্যা সন্তানকে কখনোই পুত্র সন্তানের সাথে বৈষম্য, বঞ্চনা বা তারতম্যের মাপকাটিতে ফেলে সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ তরা উচিত নয়।

সামাজিক প্রেক্ষাপটেও কন্যাসন্তানকে বৈষম্যের চোখে দেখা কখনোই উচিত নয়। তার যথাযথ সম্মান প্রদান আমাদের কর্তব্য। আর তখনই সমাজে ফিরে আসবে শান্তির সুশীতল ধারা।

প্রতিটি কন্যাই পাক সমান গুরুত্ব, প্রতিটি কন্যাই বিকশিত হোক আলোর প্রান্তরে।

অসংখ্য ভালো মানুষে, অপার প্রকৃতির পারিপার্শ্বে, সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবীতে পদচারণে মুখরিত হোক সকল কন্যা।

পিতামাতা, অভিভাবকগণ কোনরূপ বৈষম্য ছাড়াই সাবলীল পথচলায় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রেরণায় হৃদ্ধ করুক কন্যাদের পথচলা।

হীন, ঘৃণ্য গুটিকয়েক নরপশু যদি কখনো কন্যাদের পথে বাধা হতে আসে, সকলের প্রতিবাদের স্রোতে নিশ্চিহ্ন হোক সেসব গুটিকয়েক মানব নামের দানবেরা।

এই হোক “আন্তর্জাতিক কন্যাসন্তান দিবস”-এ একজন কন্যা সন্তানের বাবার শুভকামনা।

——
মোঃ নাজিম উদ্দিন
চট্টগ্রাম : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

343 COMMENTS