অধরা স্বপ্ন

0
4

অধরা স্বপ্ন

ছোট ছেলেটাকে কখনোই বুঝানো যায়না। হাশেম সাহেব তার দুই ছেলের মধ্যে বড়জনের মধ্যেই নিজের অবয়ব খু্ঁজে পান। ছোটটা কেমন জানি অবাধ্য, অগোছালো, একগুঁয়েমিতে ভরা..
সেদিনের কথা হাশেম সাহেব ভুলকে পারেনি। জুতার দোকানে দুই ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করলেন হাশেম সাহেব। গ্রামের বাজারের সবচেয়ে কোণার, সবচেয়ে ছোট দোকানে আসলেন, যদি একটু সময় নিয়ে দরদাম করা যায়। বাড়ির সামনের ছোট মুদি দোকান কাম চায়ের স্টল থেকে যৎসামান্য আয়, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে বছরের মাঝামাঝিতে নতুন জুতা কেনার সাধ মেটানো হাশেম সাহেবের কাছে বিলাসিতাই। তবুও ছোটছেলের বায়না মেটাতে যান বাবা।

এমনিতেই অতিরিক্ত দরদামে অভ্যস্ত হাশেম সওদাগরকে বাজারের দোকানদারেরা পছন্দ করেননা। ঘর্মাক্ত শরীরের, ছেড়া, বহুবার সেলাই করা সেন্ডেল পড়ে দোকানে হাশেম সাহেবের আগমন বড়ই অপ্রত্যাশিত। তবুও দুই ছেলের কারণে দোকানি মুখ বুজে সব শুনছে।

রাদিদ বড়ই দুষ্টু। জুতো দেখতে গিয়ে ইতোমধ্যে শেলফ থেকে কয়েকজোড়া জুতা ফেলে দিয়েছে। তার বড়ভাই হামিদ চুপচাপ বসা। ক্যাডস জুতা কেনা বড় শখ রাদিদের। কিন্তু দাম ৭০০ টাকা দেখে চোখ কপালে উঠে হাশেম সওদাগরের। বাজারে এসে এক বন্ধু।থেকে ৩০০ টাকা ধার নিয়ে নিজের ক্যাশবক্সে থাকা ৭০০ টাকার পুরোটা নিয়ে এসেছিলেন দুই ছেলের জুতা কেনার জন্য। রাদিদ তার স্কুলের বন্ধুদের মতোই ৭০০ টাকার জুতাটা কিনবেই। হামিদ বাবার দুঃখ বুঝে। সে বলে, আমার কিছু লাগবেনা, বাবা।

বাজার সদাই কেনার জন্য হাশেম সাহেব ৩০০ টাকা আলাদা করে রাখলেন। হামিদের জন্য ১৫০ টাকার প্লাস্টিকের একজোড়া জুতা কিনলেন। অনেক দরদাম করে কিছুটা লো কোয়ালিটির একজোড়া কেডস ব্যবস্থা করলেন তিনি। নিজের হাতে রাখা ৫৫০ টাকা দোকানদারকে দিয়ে বললেন, আর নেই। আর ৫০ টাকা আগাম সপ্তাহে দিবো। দুই ছেলেকে নিয়ে বাজার সদাইসহ বাড়ি ফেরেন হাশেম সওদাগর। বুকে হাকাকার, পেটে ক্ষুধা, মনে পাওনা পরিশোধের তাগাদা থাকলেও ছোটছেলের মুখে কিছুটা হলেও হাসির দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য সব দুঃখ ভুলে যান তিনি।

পরেরদিন রাদিদের স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। হামিদের মতো পড়াশুনায় খুব ভালো না হলেও খেলাধুলায় তার নাম ডাক আছে। স্কুল থেকে ইউনিফরমের জার্সি আর প্যান্ট দেয়া হয়েছে আগেই।! টানটান উত্তেজনা রাদিদের মনে। সে এবার দারুন ফুটবল খেলবে। সময়ের আগেই স্কুল মাঠে চলে যাবে সে। কী স্বপ্ন! কী আবেগ!
বড়ভাই আর বাবাকে বলে রেখেছে সে, দুপুরে খেয়েই স্কুলমাঠে চলে যেতে হবে।

যে কথা, সেই কাজ। পরদিন দুপুর একটায় খানাপিনা শেষ করে হামিদকে সাথে নিয়ে জোরপায়ে ছুটছে স্কুলমাঠের পানে। মাকে বলে, আজ কিন্তু ট্রফি নিয়েই আসবো মা। মা দোয়া করে দিলো। হামিদ বারবার নিষেধ করে, এত জোরে হাঁটিস না। নতুন জুতা ছিঁড়ে যেতে পারে। কার কথা কে শুনে!
স্কুলমাঠে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিলের মাঝে দিয়ে ছুটছে রাদিদ। হঠাৎ বিলের একপাশ থেকে দড়ি ছেঁড়া এক ষাঁড় ছুটোছুটি করতে লাগলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের দিকে তেড়ে আসতে থাকায় দুই ভাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বিপরীত দিকে ছুটতে থাকলো তারা। ছোটভাইয়ের দৌড়ের বেগে পায়ে থাকা নতুন জুতা দুটোই ছিড়ে গেলো। ষাঁঢ়ের ছুটে আসা দেখেও ভিত না হয়ে নিজের ছেঁড়া জুতাজোড়া হাতে নিয়ে নিরাপদে দাড়ালো রাদিদ।

ততক্ষণে মাইকের আওয়াজ শোনা গেলো। ফুটবল ম্যাচ শুরু হবে। কিন্তু রাদিদ বুঝতে পারেনা কী করবে! ক্যাডস ছাড়া তাকে যে মাঠে নামতে দেয়া হবেনা! তার শ্যামবর্ণ চেহারায় উৎকন্ঠার ছাপ, মনটা করছে দুরুদুরু!
সে দ্রুত বাবার কাছে আসলো। রাদিদের অবস্থা দেখে বাবা দ্রুত জুতাজোড়া নিয়ে ছুটে গেলেন মুচির কাছে। মুছি আজ আসেনি। আজ যে হাটবার নয়। ছেলেকে অভয় দিয়ে বাড়িতে গেলেন হাশেম সাহেব।
মধ্যবিত্তদের সব জেনে রাখতে হয়। জুতা সেলাই থেকে বেড়া ঠিক করা, জাল বুনা, হালচাষ, মাছ ধরা -সবই।
গুনা তার গরম করলো। তার দিয়েই সেলাই করতে লাগলো জুতা জোড়া। এরপর রাদিদকে বললো, ছুটে যেতে। রাদিদ খালি পায়ে ছুটে চললো স্কুল মাঠের দিকে। ছুটছে তো ছুটছেই।
স্কুলের কাছে পৌঁছানোর পথেই শুনতে পেলো বিশাল কন্ঠে শুনতে পেলো ‘গোওল”…। সব স্বপ্ন প্রায় চূর্ণ! তবুও ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে যদি পৌঁছাতে পারে, সে চিন্তা! স্কুলের গেইটের কাছে পৌঁছাতেই রাদিদ দেখলো তার টিম স্বপ্নের ট্রফি হাতে মিছিল করছে।
রাদিদের হাতে শুধু দুটো নতুন জুতো!


মোঃ নাজিম উদ্দিন
জুলাই ১৪, ২০২২