অগোছালো ভাবনাঃ মোরা সব ভুলে যাই…!

রাজা ডানকান তখনো রাতের ভোজ সম্পূর্ণ সমাপ্ত করতে পারেননি; দাওয়াতকারী সেনাকর্মকর্তা (সম্পর্কে আত্মীয়ও) ম্যাকব্যাথের আতিথেয়তার আতিশয্যে বিভোর রাজা। ম্যাকবেথ কি ভেবে রেখেছিল তা বুঝে উঠার আগেই লেডি ম্যাকব্যাথ ক্ষমতার লোভ, মসনদের মোহ আর রাণী-সাজে নিজেকে ভাবার স্বপ্নপূরণের কঠিন পন্থা নিয়ে ম্যাকবেথকে রাজি করাতে সক্ষম হন। আর সে পরিকল্পনার চূড়ান্ত ফলাফল সেনা কর্মকর্তার হাতে রাজা ডারকান হত্যা, মসনদে ম্যাকব্যাথ আর তার চতুর রাণী!

ম্যাকডাফ পুত্রের যথার্থ বর্ণনা,  “there are / liars and swears enough to beat the honest men and / hang them up.”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, “What’s done is done.”

কিং লিয়ার, ‘every inch, the King of England’ বৃদ্ধকালে তিনকন্যার মধ্যে রাজত্ব ভাগ করে দিতে চাইলেও নিজের আবেগের বশবর্তী হয়ে ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে গেলেন।
বড় দুই কন্যা রিগ্যান ও গনেরিল অভিনয় আর চতুরতায় বাবার মন জয় করলেও সোজাসাফটা কথা বলতে পছন্দ করা আন্তরিক ছোট মেয়ে কোরডেলিয়ার কথায় ততটাই বেজার ও ক্ষুব্ধ কিং লিয়ার। অথচ, সম্পদ-সম্পত্তি পেয়ে সে বড় দুজনের জন্যেই পথে নামতে হয়েছে ৮০ বছর বয়সী রাজা লিয়ারকে।

বিশ্ববিখ্যাত কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের দুটি বিখ্যাত নাটক “ম্যাকব্যাথ” ও “কিং লিয়ার” নাটকদ্বয়ের উপরোক্ত দুই ঘটনা নাটকদুটো রচনার ৪০০ বছর পরেও যেন সমকালীন। Treachery,  Betrayal, Conspiracy,  ungratefulness এসব সভ্যতার উৎকর্ষতার সাথে পাল্লা দিয়েই যেন চলছে। দিনশেষে অনুতাপ, মনোকষ্ট, আরো কত কী! বাংলার ইতিহাসে ঘসেটী বেগম, মীর জাফর বা।মীর সাদিক, সংশপ্তকের ‘কান কাটা রমজান’-রা এমনই, তাদের উপস্থিতি যুগোত্তীর্ণ!

ব্যক্তি জীবনে আপনি দেখবেন, যার কাছ থেকে প্রত্যাশা বেশি, তার কাছ থেকেই প্রতারণা বা অপ্রত্যাশিত মনোকষ্ট বেশি থাকে! দুঃখের ব্যাস-ব্যাসার্ধ বেড়ে যাবে যখন দেখবেন, আপনার কাছ থেকে শেখা বা জানা বিষয় বা বিদ্যা আপনাকে ঘায়েল করার কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে! কর্পোরেট পেশাগত প্রতিবেশে তা বেশি লক্ষণীয়!

খুব কাছের মানুষকে খুব কাছের জেনে, ভেবে কত কথাই না বলছেন! যখন কোন কারণে সে “কাছের মানুষ” এর সাথে কোন ককারনে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হলে দেখবেন, আপনার তথ্য দ্বারাই আপনাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে চাইবে!

এটা ভেবে আশ্চর্য হবেন না, কোন বিষয়ে আপনার প্রাথমিক সহায়তা থাকলেই আপনার উপকার ‘তিনি’ বা ‘তারা’ মনে রাখবেন; যেমন, কারো বিয়ের ব্যাপারে মূল তথ্য বা যোগাযোগ আপনি করিয়ে দিলেও দাওয়াত তো নয়-ই, জানতেও পারবেন না কত আগেই সব কার্যাদি সমাপ্ত!

শিক্ষাজীবনে যে অস্বচ্ছল ভেবে বা জেনে যে ছাত্রকে (টিউশনিতে) পড়িয়ে মাস শেষে টাকা নেননি, দেখবেন- অনেকদিন পরে সে ছাত্রের কাছ থেকেই সম্মান, এমনকি চোখে চোখ পড়লেও সালাম পাবেন না!
সত্যিই সেলুকাস! বিচিত্র!

আপনার দেনাদার যখন আপনার তিন অংকের ক্ষুদ্রতম সংখ্যা-সম দেনা পরিশোধ করতে পারেন না অথচ ‘ফেইসবুকের কল্যাণে’ যখন নামকরা রেস্টুরেন্টে ‘চেকইন’ স্ট্যাটাস দেখেন, তখন কোন রিএকশন দিবেন, তা ভাবা ছাড়া কী করার আছে?! পড়ার জন্য বই ধার
করে তা ফেরত দেয়ার প্রবণতা তো নাই-ই, কোনদিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না, তেমন মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ!

বিশ্বাস আর সৌহার্দ্যের দুনিয়ায় এত অবিশ্বাসের কথা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার হেতু কি- দা ভাবছেন তো? সহজ উত্তর- কিছু করে পরে যেন অনুতাপে জ্বলার চেয়ে দেথে-বুঝে করা ঢের ভাল!
অতি পরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু ক্রয় করতে গেলে নিজে লজ্জাবোধের কারণে দরাদরি করলেন না, বিক্রেতাজনও বলতে পারেন, ‘আরে ভাই, দিবে আর কি একটা, আগে নিয়ে যান তো’! এবার
পরিশোধ করতে গিয়ে দেখবেন, বাজার দরের বেশি বই কম নয়-ই! চোখ তখন কপালে, তবুও অনিচ্ছার হাসি হেসেই বিদায় নিতে হয়!

পরার্থে কিছু করতে চাইলে নাম, প্রতিদান বা ফেরতের আশা বাদ।দায়ে করতে পারলে, ত্রিভুবনেই লাভ! অর্থ ধার দেনা, কারো কোন উপকার করার বিষয় ইত্যাদি আসলে, নিজে পুরোপুরি সমর্থ না হলে ভদ্রভাবে ”না” বলতে পারেন, তো সর্বোত্তম; নইলে সে পরিমাণই দিন, যা ফেরত বা কৃতজ্ঞতা না আসলে আপনার ততটা ক্ষতি বা মনোকষ্ট হবে না বলা যায়..

মানুষ ভুলে যায়, সব ভুলে যায়..
সে আক্ষেপেই হয়ত উক্তিটি: ‘I will be forgotten from the minds of the people soon after my death”: উক্তিটি সম্ভবত, বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী বহুভাষাবিদ ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর!

তবুও বঙ্কিমচন্দ্রের “উপকূলে” গল্পের প্রধান চরিত্র নবকুমারেরা উপকূলে গিয়ে সঙ্গীদের অন্নসংস্থানের তরে জ্বালানি আনতে যায়; নবকুমারেরা জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছে ভেবে সঙ্গীরা জাহাজ ছেড়ে চলে গেলেও….
নিঃশব্দে, নিঃশেষে….

———-
মোঃ নাজিম উদ্দিন