জীবন যখন যেমন: সময়মতো ‘না’ বলা না বলা

0
1

জীবন যখন যেমন: সময়মতো ‘না’ বলা না বলা

সময়মতো “না” বলতে না পারা জীবনের ব্যর্থ দিকগুলোর একটি।

আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কথা দিয়ে কথা রাখার আপ্রাণ
চেষ্টা করা।
পরেরটাকে দুর্বলতা ধরে নিলে এক্ষেত্রে নিজেকে সবচেয়ে দুর্বল মনে করি। আর কথা রাখতে গিয়ে যে বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়, তাতে সময়, শ্রম ও অর্থের যে “ব্যয়” হয়, আর মানসিক সংকট ও চাপের যে সম্প্রদান হয়, তা অপূরণীয়।

ছোটবেলায় এক ক্লাবের সভায় যাওয়ার আশ্বাস দেয়ার পর যথাসময়ে হাজির হয়ে দেখলাম, আমি একাই উপস্থিতি! তখন মোবাইলের যুগ ছিলনা। পরে সহকর্মীদের সাথে দেখা হতেই বলা হলো, আগের দিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাত! আর আমার পক্ষে যুক্তি ছিল সময়মতো উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয়তা, যে কোন মূল্যে। এরূপ কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য একটা উপায় বের করেছিলাম সেই মোবাইলবিহীন যুগে। যেমন চকবাজার কোন বন্ধুর সাথে দেখা করার কথা থাকলে বলতাম, শাহেন শাহ মার্কেটের সামনে সকাল ৯ টায় উপস্থিত থাকতে, আর যেই আগে আসবে, সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট অপেক্ষা করবে, এরপর যে যার মত চলে যেতে পারবে!

আর্থিক বা অন্যান্য সামর্থ্য থাকা বা না থাকার প্রশ্ন অবান্তর ভেবে যারা জোর করে কোথাও যাওয়ার “দাওয়াত” দেন, তাদের “না” বলার কৌশল আয়ত্ব করতে না পারাটা সত্যিই অযোগ্যতা; আর সেরূপ অযোগ্যতা বয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণা
চাপে মনের উপর। তাছাড়া, মনে ঘৃণা রেখে উপরে দাঁত বের করে হাসার অভিনয়টাও বিরক্তিকর, তবু করতে হয় মাঝে মাঝে।

কেউ অর্থধার চাইলে প্রথম বারে ভদ্রভাবে “না” বলার সাহস যেন বাঁচিয়ে দেয় “অর্থ, সময় ও সম্পর্ককে”; আর আমাদের মত উদীয়মান অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশে এটা কষ্টকরও। জাপানের মত উন্নত দেশসমূহে পকেটে ডিনারের টাকা না থাকলে কিছু চনা-বাদাম খেয়ে পার্কে ঘুরে সময় পার করার উদাহরণ দেখা যায়, আর অতিথিকে ১০ আইটেম দিয়ে মেহমানদারী করার জন্যও ধার করতে দ্বিধা করেনা অনেক স্বদেশি! ধারের অর্থনীতির এ এক নির্লজ্জ্ব উপাখ্যান!

আমার মতে, নিজের জীবনে অন্যের উপর বোঝা না হওয়া থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হল, যত টুকু সম্ভব কম বস্তু বা সম্পদ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা!
তাইলে, আপনার কারণেও অন্যকে “না” বলা অনুশীলন করতে হবে না, নিশ্চিত।
“How many things a mon can do without”- সর্বকালের সেরা দার্শনিকদের অন্যতম গ্রিক শিক্ষক সক্রেটিস এই কথাটিই আউড়াতেন সবসময়; ফলে নিজেও ছিলেন সুখী, শিখিয়েছেনও প্রকৃত সুখের দর্শন।
জানাজার পূর্ব মুহুর্তে স্বজনেরা যে আহ্বানটি করে, ত হল- মৃত ব্যক্তির কাছে যদি কেউ অর্থ পেয়ে থাকেন, তাহলে তা আদায়ের জন্য যেন পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে; প্রশ্ন হল, কয়জন ব্যক্তি আছে যে জীবিত অবস্থায় ধার করেননি? সে ক্ষেত্রে, কয়জনই বা অর্থ আদায়ের জন্য যোগাযোগ করে? হতে পারে, কিছু স্বচ্ছল পাওনাদার স্বেচ্ছায় ঋণের দাবী মওকুফ করে দিলেন, কিন্তু সবাই কি সেটা পারে? “লজ্জায় বলতে না পারা” সেসব লোক নিজের অর্থকষ্টেও চুপ থেকে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক (অধিকার) কি আদায় হয়?

“Cut your coat, according to your cloth”- ছোটবেলায় এই ইংরেজি translation শিখতে হলেও “না” বলতে না পারার কারণে নিজের অজান্তেই আমরা পরে যাই “ধার” এর ধারে। কিন্তু, আপনার তিরোধানে কে-ই বা এর দায়িত্ব নিবে??

অর্থের চেয়েও মূল্যবান যে সম্পদ “সময়” ও অপচয় বা অপব্যয় হয় এই “না” বলার ব্যর্থতায়! প্রতিটি মুহূর্তই যেখানে হিসাবের আওতায় আনা হবে, সেখানে শুধু “না” বলতে না পারায় সহস্র মিনিট ব্যয়িত হচ্ছে, তার হিসাব নেই। একটা বিয়েকে ঘিরে ৪/৫ টা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার “নীরব বেদনা” বেদনাদায়ক বটে..
সিদ্ধান্ত আপনার।

কথাগুলো খুব নেতিবাচক শোনাতে পারে; কথাগুলোর অর্থ এ ও নয় যে, আপনি আপনার কাছের জন, আত্মীয়-পরিজনকে দেখবেন না বা তাদের জরুরি প্রয়োজনে সময়-অর্থ দিবেন না- নিজের অবস্থা বা পরিস্থিতির কথা ভেবে কাজ না করলে আখেরে আপনাকেই পস্তাতে হবে, সুনিশ্চিত।
সব হারানোর আগেও যাদের এখনও সুযোগ আছে, তাদের জন্য কথাগুলো কাজেও লাগতে পারে….

মোঃ নাজিম উদ্দিন:
১৭-০১-২০১৯