নীরব ঘাতকঃ উচ্চ রক্তচাপ

0
11

নীরব ঘাতক: উচ্চ রক্তচাপ
ডাঃ মোঃ মোজাম্মেল হোসেন
————

বিশ্বব্যাপি প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগেছেন, এর অর্ধেকই জানেননা তাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (Hypertension) আছে। এর অর্থ আমাদের আশেপাশে অনেকেই উপসর্গ ও লক্ষন ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।

প্রতিবছর ১৭মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হয়। বরাবরের মতো এবারো পালিত হয়েছিল আর এই দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো ” Measure your Blood pressure, Control it, Live longer” – রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন, বেশি দিন বাঁচুন।
আমাদের স্বাভাবিক রক্তচাপ সিস্টোলিক (হৃদযন্ত্রের সংকুচিত অবস্থায়) ১২০মিমি মার্কারি আর ডায়াস্টোলিক (হৃদযন্ত্রের প্রসারিত অবস্থায়) ৮০মিমি মার্কারি অর্থাৎ স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ মিমি মার্কারি বা এর কম। প্রিহাইপারটেনসন হলো উচ্চরক্তচাপ হওয়ার পূর্ববর্তী অবস্থা এবং এ অবস্থায় সিস্টোলিক ব্লাডপ্রেসার ১৩০-১৩৯ মিমি মার্কারি, ডায়াস্টোলিক প্রেসার ৮৫-৮৯ মিমি মার্কারি। এ অবস্থায় সতর্ক থাকতে হবে যাতে পরবর্তী স্টেজ অর্থাৎ উচ্চরক্তচাপ যাতে না হয়। তাহলে আমরা বলতে পারি আমাদের স্বাভাবিক রক্তচাপের রেঞ্জ সিস্টোলিক ১২০-১৩০ আর ডায়াস্টোলিক ৮০-৮৫ মিমি মার্কারি।
এবার উচ্চরক্তচাপ কে তিনটি স্টেজে ভাগ করা হয়েছে :
স্টেজ ০১: (মৃদু)
সিস্টোলিক ১৪০-১৫৯ মিমি
ডায়াস্টোলিক ৯০-৯৯মিমি
স্টেজ ০২: (মাঝারি)
সিস্টোলিক ১৬০-১৭৯ মিমি
ডায়াস্টোলিক ১০০-১০৯মিমি
স্টেজ ০৩:(মারাত্মক)
সিস্টোলিক ১৮০মিমি এর বেশি
ডায়াস্টোলিক ১১০মিমি এরবেশি

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ামক বা রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যার মাধ্যমে বুঝা যায় কারা ঝুঁকিতে আছেন, যেমনঃ
১) বয়স (Age): বয়স বাড়ার সাথে সাথে রক্তচাপ বাড়ে
২) লিঙ্গ (Sex): মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়।
৩) তামাক সেবন(Tobacco) : জর্দ্দা, গুল বা তামাক সেবনকারিদের বেশি হয়।
৪) ধুমপান( Smoking) : ধুমপায়ীদের বেশি হয়।
৫) স্থুলতা (Obesity)
৬) মদপান (Alcoholic)
৭) রক্তে কোলেস্টেরল যাদের বেশি থাকে
৮) ডায়াবেটিস
৯) জেনেটিক :কিছু কিছু ক্ষেত্রে বংশানানুক্রমিক ভাবেও হতে পারে
১০) অতিরিক্ত লবণ খাওয়া : অনেকে পাতে অতিরিক্ত কাঁচা লবন খায় যার কারনে  উচ্চরক্তচাপ হতে পারে।
১১) অতিরিক্ত মানষিক চাপ বা স্ট্রেস: আধুনিক সভ্যতার বদৌলতে সবাই এখন প্রচন্ড ব্যাস্ত স্ট্রেসড জীবন যাপন করে।

উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক, জটিলতা তৈরি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অনেকসময় কোনো উপসর্গ বা লক্ষণ নাও থাকতে পারে। অনেকক্ষেত্রেই অন্য কোনো রোগের জন্য গিয়ে চিকিৎসকের কাছে ধরা পরে।
কিছু উপসর্গ ও লক্ষণ:
** মাথা ব্যাথা
**ঘাড় ব্যাথা
** চোখে ঝাপসা দেখা
**শ্বাস কষ্ট হওয়া
** নাক দিয়ে রক্তপাত

উচ্চরক্তচাপের কারণে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয় :
** হার্ট এটাক বা হৃদযন্ত্রের জটিলতা
** স্ট্রোক বা ব্রেইনের জটিলতা
** কিডনির জটিলতা বা নেফ্রোপ্যাথী
**চোখের জটিলতা বা রেটিনোপ্যাথি
** আর্টারিওস্কেলেরোসিস বা রক্তনালীর জটিলতা।

উচ্চরক্তচাপ থেকে মুক্তির উপায় :
প্রথমত: আমাদের বদঅভ্যাস ছাড়তে হবে যেমন: বিড়ি সিগারেট মদ ইত্যাদিদি।

দ্বিতীয়ত: নিয়মিত শরীরচর্চা বা এক্সারসাইজ করতে হবে, ওজন কমাতে হবে, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে হাটতে হবে।

তৃতীয়ত: খাদ্যাভ্যাস এ পরিবর্তন আনতে হবে। সুষম খাবার খাওয়া এবং তেল চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করে সবুজ শাক সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ডায়াবেটিস বা রক্তে কোলেস্টোরল থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত বিরতিতে রক্তচাপ মাপতে হবে। পারস্পরিক আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে হবে।প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

———————-
ডাঃ মোঃ মোজাম্মেল হোসেন
এমবিবিএস, বিসিএস
মেডিক্যাল অফিসার
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।