জীবনটা কতই না ছোট!

0
44

(শিরোনামহীন বিচ্ছিন্ন ভাবনারাশি!)

ছোটবেলায় পুকুরে সাঁতারের পর আবার সাঁতার-মনে হয় পুকুরে সাঁতার না কাটলে দুপুর/বিকাল পার হবে না! আর এখন? গ্রামে গেলেও পুকুরের সাথে কিয়দ দেখা বা আলিঙ্গনেরও সুযোগ কম!

গ্রামের বাদামতলের পাশে শীতের সকালে রোদ পোহানোর আগে কোথাও যাওয়াই হতো না; খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে উঞ্চতার পরশ লাগাতেই হতো!

বাড়ির পাশের বৈঠকখানায় সময় না কাটালে দিনটাই পার হতো না! আর আজ? আহা সময়!

“At my back, I always hear/ Time’s Wing’d chariot hurrying near”..

ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে স্কুল ছুটির মজার সকাল, দুরন্ত দুপুর কিবা শ্রান্ত বিকেলে মাঠে না গেলে যেনো পেটের ভাত হজম হয় না কিশোরের! বাড়ন্ত যৌবনের পর সে অন্তরঙ্গ মাঠে যাওয়ার সময় কই?

প্যারেডে বিকেলটা কাটানো, বা মশার কামড় ভুলে মাঠে বসে শিরোনামহীন আড্ডা কিবা জয়নগর বা সাইমুন হোটেলে সান্ধ্যকালীন আড্ডা, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দি বা সবুর হলে বন্ধুদের সাথে ঘড়ি না দেখা সময় কি আর আসবে? অস্তিত্ববাদী বন্ধুগণ, কিংবা জিন্দা পীরের মাজার খ্যাত হোস্টেলে বন্ধু নাসিরের “সিরিয়াস” পড়াশুনা, “ধান্ধা তুমি” কবিতার বাংলা বিভাগে পড়ুয়া ছাত্র-চরিত্রের নিরব কান্নার মুজার কথা আজো কি কেউ মনে রাখে, মোবারক? ডিপার্টমেন্টের সব প্রোগ্রামের খরচ প্রমাণে ভাউচারের কথা মনে আছে, সোলায়মান? না, সময় বড় ব্যস্ত, বন্ধু!

“Time is an old gypsy man”…

তেপান্তর মেসের ওসমান ভাইয়ের দেখা বা তারেকদের সাথে গ্রুপ ডিসকাশনের সন্ধ্যা ছাড়া যাদের রাত আসতো না, কয়েকবছরেও সে মাঠ, হল বা মেসের অাড্ডার সারথিদের সাথে দেখা হওয়ারই সময় কই? “The world’s too much with us..”

যে বাসায় ব্যাচেলর অবস্থায় ভাড়া থাকে চাকুরি প্রত্যাশী সদ্যপাশ যুবক, সে বাসার প্রতিটি স্মৃতি তার মনে থাকে, লবণ-মরিচের অসংলগ্ন মিশ্রণের রান্নায় ক্ষুধার্ত লাঞ্চের পর অগোছালো রান্নাঘর, মশারি টাঙানো অবস্থায় বেডরুমের “ব্যাচেলর” দৃশ্য সে ভুলতে পারে না কিছুদিন! বাসা ছাড়ার সময় মনে হয়, কিছুদিন পর পর সেখানে স্মৃতির টানে যাওয়া হবে নিয়মিত, কিন্তু যুগ পেরিয়েও যাওয়া যায় কি?

যে কর্মস্থলে বছর-যুগ পার করে  “second home” বানায়, সে চাকুরে পরে কোনবার যেতে পারে সাবেক সে কর্মস্থলে? কর্মস্থল-পরিবারের সেসব সদস্যের দেখা বদলির পর মেলানো দেখা দায়! সময় বড় ব্যতিব্যস্ত! প্রিয় সহকর্মি পুলক দা, নুর উদ্দিন ভাই বা আদনানরা ইতিমধ্যেই ইহলোক থেকে সময়ের আগেই চির-অবসরে!

আর্য, পাল, সেন, মোগল ব্রিটিশ – কত শাসনামল, কত নবাব আজ ইতিহাস! কত সাম্রাজ্য আজ চারণভূমি, কত সম্রাট-উত্তরসুরী আজ মঞ্চ থেকে চরণে – সময়, তুমি কখন কার?

” Life’s but a walking shadow”…

আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো? কতজনের সাথেই একবার দেখা হওয়ার পর আর দ্বিতীয়বার দেখা হয়নি জীবনে, তার তালিকা কত দীর্ঘ, জানেন?

নোটপ্যাডে সেইভ করা গুরুত্বপূর্ণ লেখনি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বই মেলা বা বাতিঘর থেকে কত রেফারেন্স বই কিংবা জীবনি গ্রন্থ কিনে এনে মনে হয় রাতেই শেষ করে ফেলব, কিন্তু শেষ করা যায় নি অনেক বই। সব বই কি শেষ করা যায় জীবনে? তার পরও নতুন বই কিনি পড়ার আশায়, অপেক্ষায়! কত বইয়ের “ক্রেতা” পাঠক হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে অকালে!

বছর এসেছে যেন সেদিন, কত সি,এল, ই,এল বা এস,এল রয়েই গেলো, কোন পলকে শেষ কর্মদিবস চলেই গেলো, বুঝার উপায় নেই। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, পৌঢ়ত্ব এভাবে পলকেই নিঃশেষ হয়ে যায়-কত to do list অসমাপ্ত থেকে যায় কাল করছি ভেবে রাখলেও! টাইম ইউ আর ইউনিক!

“A Brief History of Time” যেন মহাকালের কৃঞ্চগহবরে ঢুকে যাওয়া ছোট এ ভবশহরের প্রতি ঠাট্টা!

মহাকাল “লা মকান” বা সময়ের অস্তিত্বের বিপরীতে অনন্ত কালের তুলনায় নিমিষ-মুহুর্তের এ ভবলোকে জন্মের সময় দেয়া আজানের নামাজ হয় জানাজার নামাজে। মাঝখানের এক পলকের এ আয়ুষ্কালে কত কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও করা হয়ে উঠে না!

এক  ন্যানোসেকেন্ড থেকে যাত্রা শুরু সে অায়ুষ্কালের ডেডলাইন যখন জানাই নেই, তখন দ্রুত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শেষ করতে পারাই অর্জন।

সেদিনের “বর্তমান” কখন যে “অতীত” হয়ে গেলো, কখনই বা দূরে মনে হওয়া ভবিষৎ চোখের সামনে “আজ” হয়ে ধরা দিল কিছু বুঝার আগেই – তা দেখে বিস্ময়ে জাগার সময়ও বা কই!

আর সমস্ত “আগামী” বর্তমান হওয়ার প্রস্তুতিতেই কত দ্রুত “অতীত” হওয়ার যাত্রা শুরু করে “অতি সংক্ষিপ্ত ” এ জীবনে- যার যবনিকাপাত  very unpredictable, very startling! Very mysterious!

—-
মোঃ নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম
nazim3852@gmail.com